আজ , ।   

সৈয়দ রনো’র দশটি কবিতা

আরো খবর

প্রতিচ্ছবি
সৈয়দ রনো

পাহাড়ের খাচকাটা ভাঁজে
ভেসে যায় মৌন মিছিল
রাতজাগা আলিঙ্গন
বধূর ফিসফাস শব্দ মিলায়
পাখির কলরব
নওজোয়ানের তারুণ্যে
সাদা ধব ধবে উড়ন্ত বলাকা
পলাশীর দিগন্তে অস্তমিত সুখ
তবু রুখেনি বাংলার ডুবন্ত সূর্য
ক্লান্তির তল্লাটে ভেসে ওঠে
কামপিয়াসী মন
লাজুক চাহনীর ফাঁকে
খেলা করে আগুনলাগা রূপের প্রতিচ্ছবি
টলমলে যৌবন

ছায়া আর কায়া একাকার হতে হতে
নান্দনিকতার নেশায় তৃষিত হৃদয়
চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভরেছে
কাব্যিক আলোর প্রজ্জ্বলনে
তারুণ্যের বাতিঘর

সখির নিকষিত প্রেম
জমেছে এক ঘোরলাগা ঘোরে
চাঁদের কিনারে
জোছনার মিছিল
দেখি তার নিভাঁজ মুখচ্ছবি
পড়ন্ত বিকেলের শৈল্পিক সাঁজে

কোন এক পূর্ণিমার রাতে
ঠোঁটের দু’পাট্টায়
কী যে কথা কয়
জাগে শুধু ভয়
চুপিসারে তারার বাসর

তেঁতুল কাষ্ঠে পোড়া
জোড়াতালি মন
মেতেছে বাউল নেশায়
বিরহের মাতামাতি

 

ঘোরলাগা কোনো এক ঘোরে
খুঁজি আমি তারে
দেখেছি চৈত্র দুপুরে
গঙ্গাস্নানের শুভ্রতা নিয়ে
ঘূর্ণায়মান খড়কুটো
ভাসানোর তোড়ে

বেদনায় নিমজ্জিত ভাসমান স্রোতে
আজন্ম ভাসিয়েছে সখি
কী দুপুর কী বিকেল
নিদারুণ তারুণ্যের সকাল
মিশে গেল সব
মিশকালো রাতের গহিনে

ঘোরলাগা কোনো এক ঘোরে
খুঁজি আমি তারে
শরীরের ভাঁজ
নিভাঁজ তার প্রতিচ্ছবি
হেমলক পানে
চোখে চোখ রাখি
পাপড়ির ফাঁকে
সুখ ঢেকে রাখে
নয়নের জল করে টলমল
দেয় সখি ফাঁকি

ঘোরলাগা কোনো এক ঘোরে
খুঁজি আমি তারে
কথা হয় চোখে চোখ রাখি।

 

 

বিশ্বায়ন
সৈয়দ রনো

মানবিকগুণের দৃঢ়চিত্ত
সবলের ঘৃণা দুখের যম
কাঙালের চোখে রক্ত ঝরে
মারছে সিমার বেরোয় দম।

পানির তোড়ে ভাসছে ফেনা
হযরত আলীর শক্তি চাই
পাহাড় গুলিয়ে বানাবো নদী
তবেই যদি শান্তি পাই।
ভাত কাপড়ের অভাব দেখি
ঘুরছে মাথায় ঘূর্ণিপাক
গরিব কাঙাল পিষছে যারা
বিশ্বায়নে নিপাত যাক।

শয়নে স্বপনে প্রেমের বাঁধনে
পাগল কেবল মজনু হয়
চন্ডিদাসের ধৈর্য সাধন
প্রেম সাগরে উজান বয়।

দেহ জমিনে লাঙ্গল চালায়
কৃষ্ণলীলা রাধার বন
কাম আগুনে ঝলসে ওঠে
নগর বাউল গুপ্তধন।

ইয়াজুজ মাজুজ বন্ধ ঘরে
ঘুরছে কেবল চতুর্দিক
খুঁড়ছে মাটি সারাবেলা
ছুটছে ওরা দিগবিদিক।

হাসান হোসেন ঘুমিয়ে কেন
কারবালাতে যুদ্ধ চাই
বঙ্গমাতার রক্ত জাগে
ঘুমের জন্য ঔষধ নাই।

 

 

সমকালীন ছড়া
সৈয়দ রনো

পেটের কাঁন্নায় জ্বলে ক্ষুধার লেলিহান
তন্দ্রাহীন মধ্যরাত যেনো শ্মশানপুরী
মশাল হাতে ছুটে চলে পোয়াতীর ভূড়ি।

ছলনার খেলা দেখি টেক্কার হাটে
তসবি তাহলিল চলে মাঠে ঘাটে
জাতি-ভেদ তুলে দেই মুর্দার খাটে
অভাগার ক্রন্দনে জনরোষ হাটে।

দুখিনী দুঃখ পেলে গালে দেয় হাত
ভন্ডও টাকা হলে সাজে ভালো জাত
কাব্যের সুধাপানে মাথা ঘুরে কাত
তৃষিত হৃদয় কাঁদে জেগে থাকে রাত।

আসলকে রেখে করি নকলের খোঁজ
অনাবাদে কাটে দিন করি ভুড়ি-ভোজ
রেডিমেড মানুষের খেলা দেখি রোজ
কবি সেজে দাম নেই কবিতার খোঁজ।

 

 

দেশাত্ববোধ
সৈয়দ রনো

চারপাশে উঠন্ত যৌবন
খেলা করে ভোরের স্নিগ্ধ সোনারোদ
চিত্রার্পিত তিলোওমা নারীর সুঠাম দেহে
এঁকে দেই শব্দের নিখুঁত বুনন
কালজয়ী পঙক্তিমালা।

কাব্যিক নান্দনিকতায়
নেশার পেয়ালা হাতে মন্দিরের প্রিয়া
দাঁড়িয়ে আছে সেই কবে থেকে।

কপালে অঙ্কিত প্রতিটি বর্ণ শব্দ
সেজেছে উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলোয়।

সব সবুজ কালো হয়ে
লুকিয়েছিলো মেঘের আড়ালে
দিগন্তকে ছিনিয়ে এনেছি
বাংলার কাব্যিক চেতনায়।

দুরন্ত ষোড়শীর আনকোরা সুখের বাগানে
বপন করেছি দেশাত্ববোধের চারা
কাব্যময়তার নতুন ছন্দ।

 

 

রোদে পোড়া ঢেউ
সৈয়দ রনো

গোধুলির লগ্ন
পূর্ণিমা দেখেনি কখনো
ঘরভোলা নারীর ঘুমন্ত স্বপ্ন
প্রকৃতির শুদ্ধ রঙে
নিজেকে সাজায়।

রোদে পোড়া ঢেউ
শামুক খোঁজা হাসের ব্যাকুলতায়
জলতরঙ্গ নাচে
কূল ভাঙে নদী।

বিদগ্ধ দেহের
প্রতিটি ক্ষত তামাশায় মাতে
দেহের পাঁজর ভাঙনের স্রোত
বয়ে যায় নিরবধি।

ভাঙনের স্রোতের বাঁকে বাঁকে
জেগে ওঠে কলঙ্কের চর
তবু স্বপ্ন দেখে নদী
জীবন্ত প্রতিদিন।

পড়ন্ত বিকেলে
ক্রমশ স্বপ্নগুলো ধূসর মলিন
ভাঙনেও স্বপ্ন দেখে নদী
জীবন্ত প্রতিদিন।

 

 

চিঠি দিও
সৈয়দ রনো

বর্ষার আগমনে চিঠি দিও প্রিয়
লাল কাঠের বাক্স পেট্রোয়
অনেক অনেকগুলো চিঠি।

তোমার সত্তার অনুভূতির প্রতীক্ষায়
ব্যাকুলতা জাগায় মনের মসৃণ গহীনে
চিঠি পাবার অপেক্ষায় প্রহর গুনি
ডাকহরকরার আগমনে

এক টুকরো কাগজ প্রশান্তি এনে দিতে পারে
হোক না কাগজখন্ড যৎ সামান্য
অঙ্গগুলি স্পর্শের কর্কশ বাক্য
নতুবা পদচিহ্ন অঙ্কিত একখানা
তেলাপোকার নকশা
ওটাই হবে অমৃতের আস্বাদন।

চিঠি দিও প্রিয়
জান না পদ্মাবতী তোমার বিরহ
কতো কষ্ট কতো বীভৎস বঞ্চনা গঞ্জনা
আর লা’নত নিয়ে বেঁচে থাকা
এখানেই তো আমার কষ্টেরা
দুমড়ে মুচড়ে দানা বেঁধে হুল ফুটিয়ে
বিহঙ্গের আলিঙ্গনে নেংটা উল্লাসে ব্যস্ত
আমার সমস্ত সত্তা আর অস্তিত্ব জুড়ে।

চিঠি দিও প্রিয়
সেলাইকরা একখানা খামে ভরে!
নতুবা কলার পাতায় সুচ দিয়ে
এফোঁড় ওফোঁড় করে
স্বরলিপির দু’চারটি বর্ণে
হলুদিয়া পাখির ঠোঁটে সেই পত্র পাবার
প্রতীক্ষায় থাকবো।

ক্ষণে ক্ষণে ঘুমের গভীরতা ভেঙে চমকে উঠি
তখনি তিক্ত বিরক্ত হয় ঝিঝি পোকা আর পাখপাখালি
চারদিকের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে পুঞ্জীভূত আমার কষ্টেরা
বিদ্রুপের হাসি হেসে করে মহা উল্লাস।

চিঠি দিও
উলঙ্গ কাগজের এক পৃষ্ঠায়
টিপটিপে প্রজ্জ্বলিত বাতির সলতের
আলোর উল্টো পিঠে তোমার মুখচ্ছবি এঁকে দিও
দেড় যুগ প্রতীক্ষায় আছি
এখনো অমাবস্যার রাতে মোমবাতি
জ্বালিয়ে অপেক্ষা করি দমকা হাওয়ায়
যখন ছিন্নভিন্ন আলোকবর্তিকা নিভে যায়
তখন চারপাশে তোমার গন্ধ শুঁকি!

কানের পর্দায় প্রতিধ্বনিত হয়
একটি চিঠি দিও
নইলে বেঁচে থাকার মন্ত্র দিও
যত্নে রক্ষিত এক চিলতে ভালোবাসা দিও
হাতের কঙ্কণের ন্যায় সোহাগ দিও!

 

 

কাব্যকলায় বিজ্ঞান
সৈয়দ রনো

হৃদয়ের ঘাস চাতালে বসেছিলো
প্রলব্ধ বিরহী হৃদয়
হাইরাইজ ভবনের অস্বচ্ছ কাঁচ
অটবির কারুকার্যময় দরজা
জ্বলন্ত সিসার দহন
আটকাতে পারেনি কিছুই
প্রসারিত বরফশীতল হাত
কমনীয় স্পর্শে ছুঁয়েছে উলঙ্গ শরীর

মনোমন্দিরের রন্ধনশালায় ঢুকে শৈল্পিক মন
যাপিত জীবনের কোলাহল পিছে ফেলে
সটান দাঁড়িয়েছি স্ট্যাচুর মখোমুখি
বৈজ্ঞানিক তেজস্ক্রিতায় রাঙিয়েছি দু’হাত
হৃদয়কে খণ্ডবিণ্ড করে বানিয়েছি কাবাব
তিক্ততায় ভাতের বদল খেয়েছি ওবামার বড়ি

ছুঁয়েছি জীবনবোধের তলানি
আমি এখনো কবিতা লিখি
কবিতা লিখি কল্পনার ঘোরে
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও
কাব্যিক চিত্রকল্পে সাজাই
আকাশ বসতী
ইউরেনাস নেপচুন প্লুটো
ধর্মযাজক আমি
প্রতিনিয়ত নাসার বিজ্ঞানীরা
মেরামত করে আমার চিন্তার জগত।

 

 

ক্লান্ত জীবন
সৈয়দ রনো

যেতে চাও যদি রুগ্ন শহর ছেড়ে
পাথালিয়া গাঁয়
সকল স্মৃতি ভুলে
দেখবে আগামীর ছায়াপথ
ঠেকাবার সাধ্য কি আমার
বিদীর্ণ বিকেল শেষে
ডুবে গেছে জীবনের দিন

ছিন্ন করতে চাও যদি মমতার ঘোর
ঠেকাবার সাধ্য কি আমার
বাধার প্রাচীর ডিঙ্গানোর ক্লান্তিতে আমি
বরফ খণ্ডের বিমূর্ত প্রতীক

ভালোবাসার ঋদি মুগ্ধতায়
ভাসিয়েছো জীবনের ভেলা
নোঙর করতে চাও যদি একঘাট ওঘাট
ঠেকাবার সাধ্য কি আমার
নোনা জলে ভিজে খসে পড়েছে
ধ্রুপদি বিশ্বাসের আস্তর
ছেড়া ফাড়া পত্র পল্লব হয়ে
শুকিয়েছে ক্লান্ত জীবন
বার বার ভেঙ্গেছে ব্যথিতের মন।

 

 

কবি হয়ে ওঠার গল্প
সৈয়দ রনো

প্রাণের উচ্ছাসে পাখনা মেলে উড়তে চেয়েছিলো সময়
কী যেনো এক ভয়াল দেবদারুর তান্ডবে
হয়ে ওঠে না ওসব

প্রণয়ের রৌদ্র খরতাপে
পুড়েছে বুকের জমিন
এক গুচ্ছ সোনালী স্বপ্ন আগলিয়ে
যন্ত্রণার মাটিতে শুয়ে থাকে খা খা রোদ্দুর
দেহের জ্বলন্ত দাহে
জীবন থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ে সময়
চিন্তার আবর্তে আমি
মা মাটির ঘ্রণে মাতাল কবি

শহরের একটি চাকচিক্যময় বিকেল
বাতাসের ইচ্ছের ডানায় ভর করে
ছুটে যায় সপ্ত আকাশের দিকে তখন নব বধূর ঘোমটার লাজে
খেলা করে নিলাভ সন্ধ্যা
গোধূলীর স্বপ্ন রঙে বাংলার আকাশ
হয়ে ওঠে কবিতার প্রহর

বাতাস কাটা যন্ত্রণায় আমি ক্ষণিকেই
বিত্তবৈভবহীন হয়ে পড়ি
সঙ্গীহীন হৃদয়ের শূন্যতায়
আমার নিঃশ্বাস ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ে
জেগে ওঠে পাড়হীন দিগন্তরেখা
মৃত মানুষের পাহারায় আলোকিত করিডোর

একটি মিষ্টি বিকেল আমার
কপালে চুমু খেয়ে বলে
তুমি তো কখনো হৃদয়ের কান্না শোনোনি
শোনোনি রাত্রির ভয়াল চিৎকার
কখনোই দেখোনি
ছোট্ট শহর কীভাবে মেঘবতী হয়ে ওঠে
এরপর তারপর দীর্ঘ ইতিহাস
ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায় আমার কবিসত্তা
স্বপ্নের ঝুলন্ত বাস্তবতায়
আমি হয়ে উঠি খেয়ালী
কবিতার বিমূর্ত প্রতীক

ধূসর জোছনায় কবিতার শীরের
এঁকে যাই বিবাগী মনের অফুরান শব্দ
মেঘাচ্ছন্ন আকাশের করতলে
অঞ্জলি পেতে কুড়াই
হাজারও রূপকথার গল্প
চিত্রকল্পের নান্দনিক ক্যানভাসে
মনের বাসর ক্রমশ জমে ওঠে
অনিন্দ্য সুন্দর শব্দ ছন্দের জমপেশ আড্ডায়
ক্ষণিকের জন্যে হলেও
আমি কবি হয়ে ওঠি।

 

 

গীতি কবিতা-১
সৈয়দ রনো

ও আমার দমের কারিগর
তুমি বান্দে সুখের ঘর
নিজের ছুরত ছাইড়ে তুমি
করলা দেহ পর
আমার দমের কারিগর।

আমি বন্দি আছি দমের ঘরে
ডুবছে সময় দেহের ভারে
মন যে কথা শোনে না
এই ধারাধাম ছাড়তে হবে
তাও তো মনে বোঝে না

দেহের খেলা সাঙ্গ হলো
মনের ঘরে রং ধরিলো
পুড়ছে সদা মন
আপন সুরত চিনতে দেখি
মনের ভিটায় বন।

আমি বইসা কাটাই নিদ মহলে
দেহের মালিক নাইরে ভবে
কেমনে হবো পার
অধম রনো কানছে বসে
পাইতে দেখা তার
ও আমার দমের কারিগর
তুমি বান্দে সুখের ঘর
নিজের ছুরত ছাইড়ে তুমি
করলা দেহ পর।

 

- Advertisement -
- Advertisement -