আজ , ।   

আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ: নামী ব্র্যান্ডের অন্তরালে শ্রমিক শোষণ আর বঞ্চনার অভিযোগ

আরো খবর

বিশেষ প্রতিবেদক

দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড (AFBL)। ‘মোজো’, ‘স্পিড’, ‘ফ্রুটিকা’ ও ‘ফার্মফ্রেশ’-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড দিয়ে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করলেও, এই কর্পোরেট সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে শ্রমিকদের ওপর চালিত এক নির্মম শোষণের চিত্র।

ধামরাইসহ বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকের ঘাম আর রক্তে প্রতিষ্ঠানটি হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়লেও, শ্রমিকদের ভাগ্যে জুটেছে কেবল বঞ্চনা, বৈষম্য এবং অমানবিক নির্যাতন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম, অথচ মজুরি নামমাত্রখাত সংশ্লিষ্ট ও কারখানার ভেতরের তথ্য অনুযায়ী, আকিজ ফুডের কারখানায় দৈনিক মজুরি ও লোড-আনলোড কাজের যে কাঠামো, তা আধুনিক দাসপ্রথাকেও হার মানায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করেন, প্রতি কেস পানীয় গাড়িতে লোড দিলে তারা পান মাত্র ২৪ পয়সা। একজন শ্রমিক সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে প্রায় ১,০০০ কেস পর্যন্ত লোড দিতে সক্ষম হন। সেই হিসেবে দিনশেষে তার আয় দাঁড়ায় মাত্র ২৪০ টাকার মতো, যা অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমান লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই অপ্রতুল আয়ে একজন শ্রমিকের পক্ষে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা তো দূরের কথা, দুবেলা ডাল-ভাত খাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বর্তমান বাজারদরের সাথে বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য না রেখে অতি নগণ্য মজুরিতে শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাজ করে গেলেও শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী করা হয় না। বছরের পর বছর তাদের অস্থায়ী বা দৈনিক ভিত্তিতে রেখে সব ধরনের আইনি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। আইন অনুযায়ী আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম থাকলেও অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে নিয়েও অনেক সময় ন্যায্য ওভারটাইম দেওয়া হয় না।

সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য আইনগত ছুটি চাওয়ায় শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ: কারখানার ভেতরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত শ্রমিকরা আহত হচ্ছেন, অথচ চিকিৎসাসেবা বা ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা রয়েছে।

এর আগে শ্রমিকদের ওপর চলা এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে কারখানার সামনে তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন গড়ে তোলেন শত শত শ্রমিক। মজুরি বৃদ্ধি, চাকরির স্থায়িত্বকরণ এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টাসহ ৯ দফা দাবি পেশ করা হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়নে টালবাহানা করে আসছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের নায্য অধিকারের কথা বলতে গেলেও বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তাদের কণ্ঠস্বর ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ বিষয়ে বারবার শ্রমিকরা স্থানীয় পর্যায়ে ও ব্যবস্থাপনার কাছে সুরাহা চাইলেও প্রভাবশালী এই করপোরেট হাউজের নীতিনির্ধারকরা বরাবরই নীরব ভূমিকা পালন করেছেন।

সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা এ বিষয়ে কারখানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিতে গেলে তাদের পক্ষ থেকেও কোনো সদুত্তর বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শ্রম অধিকার গবেষক ও সচেতন মহলের মতে, ব্র্যান্ডের মোড়কে নিজেদের সুনাম বজায় রাখলেও আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ভেতরের শ্রম অসন্তোষ যেকোনো সময় বড় ধরনের আইনি ও সামাজিক সংকটের রূপ নিতে পারে।

অবিলম্বে শ্রম আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও জীবনমানের নিশ্চয়তা না দিলে এই প্রতিষ্ঠানকে বয়কটসহ আরও কঠোর ও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার হুশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

- Advertisement -
- Advertisement -