আজ শনিবার, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ।   ২০ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মোকামতলা সপ্রাবির প্রধান শিক্ষকের বি*রুদ্ধে অ*নিয়ম ও চ*রম অ*বহেলার অ*ভিযোগ

আরো খবর

মাজেদুর রহমান, ব্যুরো চীফ:

সরকার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ডিজিটাল ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং ফ্ল্যাট প্যানেল দিচ্ছে, যেন তৃণমূলের শিশুরাও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পায়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন শিক্ষকের চরম অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগ। এর অন্যতম বাস্তব উদাহরণ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত বছরের ২৯ অক্টোবর বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মো: রাকিবুল ইসলাম। অভিযোগ উঠেছে, যোগদানের পর থেকেই তিনি প্রশাসনিক ও শিক্ষাদান উভয় ক্ষেত্রেই চরম উদাসীনতা এবং অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে আসছেন। স্কুল চলাকালীন সময়েও কাছাকাছি অবস্থিত নিজের বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া এবং অধিকাংশ সময় অফিস কক্ষে নিষ্ক্রিয় বসে থাকাই তার দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

শনিবার ২০ জুন সকাল সাড়ে নয়টার কিছু পর সরেজমিনে মোকামতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের অর্ধেক সময় পার হতে চললেও বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে কোনো নতুন ক্লাস রুটিন টাঙানো হয়নি। এখনো ঝুলছে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস রুটিন ও মনিটরিং বোর্ড। এমনকি কর্মরত শিক্ষকদের তালিকায় খোদ প্রধান শিক্ষকেরই নাম বা ছবি নেই। এই ডিজিটাল যুগে এসেও এসব সাধারণ ও আবশ্যিক বিষয়ের ঘাটতির পেছনে প্রধান শিক্ষকের চেনা অজুহাত “বাজেট নেই”। একটি সরকারি বিদ্যালয়ে রুটিন টাঙানোর মতো ন্যূনতম বাজেট থাকবে না, এমন যুক্তিকে সম্পূর্ণ ‘অসহায়ত্ব প্রমাণের অপকৌশল’ এবং দায়িত্ব এড়ানোর বাহানা বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

শিক্ষার গুণগত মানের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ বেলা ১টা ৫৫ মিনিটে বিদ্যালয়টি আচমকা পরিদর্শন করেন শিবগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ইউএপিইও) মোঃ আশরাফ আলী। পরিদর্শন শেষে বিদ্যালয়ের পরিদর্শন বহিতে তাঁর স্বাক্ষরিত অফিসিয়াল প্রতিবেদনে উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণির অর্ধেক শিক্ষার্থীই ইংরেজি রিডিং পড়তে জানে না! অথচ খোদ প্রধান শিক্ষক নিজেই এই শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস নেন বলে দাবি করেন। প্রধান শিক্ষকের এমন চরম খামখেয়ালিপনার কারণে শিক্ষার্থীদের এই প্রাতিষ্ঠানিক দশা হলেও, প্রতিবেদককে তিনি এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

বিদ্যালয়টির শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য গত এপ্রিল মাসে (প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, কোন নথি দেখাতে পারেন নি) উন্নত মানের ডিজিটাল বোর্ড দেওয়া হয়। এছাড়া রয়েছে প্রজেক্টর এবং পুরো শিবগঞ্জ উপজেলার মাত্র ৭টি বিদ্যালয়ের একটি হিসেবে এখানে দেওয়া হয়েছে অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট প্যানেল। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। প্রজেক্টরগুলো সর্বশেষ কবে ব্যবহার করা হয়েছে তা প্রধান শিক্ষক নিজেই বলতে পারেননি। এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করা হলেও কোথাও কোনো মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চলতে দেখা যায়নি। ডিজিটাল ল্যাবের ল্যাপটপগুলো সচল কি-না বা শিক্ষার্থীদের আদৌ কিছু শেখানো হয় কি-না, তা জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। শিবগঞ্জের বাকি ৬টি বিদ্যালয়ে ফ্ল্যাট প্যানেল সচল ও কার্যকর থাকলেও এখানে কেন বন্ধ, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক মুখস্থ বুলি আউড়ে বলেন, “আমাদের প্রশিক্ষিত জনবল নেই, প্রশিক্ষণ দিলে চালু হবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।”

বিদ্যালয়ের চারপাশের পরিবেশও নাজুক। ছোট্ট বাগান জুড়ে বড় বড় ঘাস গজিয়ে জঙ্গল হয়ে আছে। স্কুল চত্বরের পেছনের অংশে একটা কাটা গাছের গোড়ালি দেখা গেলেও, সে বিষয়ে প্রধান শিক্ষক কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। একই সাথে শিক্ষার্থীদের ওয়াশরুমে সাবান, হ্যান্ডওয়াশ বা টিস্যুর কোনো বালাই নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ‘স্লিপ’ (SLIP)-এর নির্দিষ্ট বরাদ্দ আসলেও তা কোথায় খরচ হচ্ছে, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। নোংরা পরিবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বর্ষা ও ঈদের ছুটির খোঁড়া অজুহাত দেন। ২০১৩ সাল থেকে কর্মরত অফিস সহায়ক (পিয়ন) মো: জুয়েলকে এ বিষয়ে কতবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে, তিনিও আমতা আমতা করে বলেন, “পরিষ্কার করে রাখবো।”

এরই মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গাইড বই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এই বিদ্যালয়ে চলছে বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থার প্রকাশ্য দৌরাত্ম্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পঞ্চম শ্রেণির এক ক্ষুব্ধ অভিভাবক আঞ্চলিক ভাষায় তার ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “হামরা গরীব মানুষ, সেজন্যে সরকারি প্রাইমারিত ছ্যোলোক পড়াচ্চি। হামরাতো প্রাইভিট দিবের পারিনে। ক্লাসের বই পড়াবি স্যারেরা, তা না করে হেডমাস্টার গাইড কোম্পানির ট্যাকা খাইয়ে গাইড কিনবের কছে। তালে প্রাইমারিত পড়াায়েও হামাগেরে লাভ কি?” গাইড বইয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে কথা বলা হলে, তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান এবং ব্যস্ত আছেন জানিয়ে দ্রুত কলটি কেটে দেন।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বিদ্যালয়টিতে কোনো আইসিটি এবং ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব যিনি গণিত, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (বাওবি) বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান, তাকে আইসিটি বিষয়ের দায়িত্ব দেওয়া কতটা যৌক্তিক? একই সাথে মূল দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষকের এমন চরম গাফিলতি, গাইড বইয়ের বাণিজ্য ও সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা মোকামতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: রেজোয়ান হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে জানান, “বিষয়টি তদন্ত করে শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে।” একই সাথে তথ্য প্রদানের জন্য এই প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।

বগুড়া জেলা ও শিবগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে উক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় অভিভাবক, এলাকাবাসী ও সুধীসমাজের।

আলোকিত প্রতিদিন/২০জুন ২০২৬/মওম  

- Advertisement -
- Advertisement -