আজ , ।   

সৈয়দ রনো’র দশটি কবিতা

আরো খবর

দেশাত্ববোধ

চারপাশে উঠন্ত যৌবন
খেলা করে ভোরের স্নিগ্ধ সোনারোদ
চিত্রার্পিত তিলোওমা নারীর সুঠাম দেহে
এঁকে দেই শব্দের নিখুঁত বুনন
কালজয়ী পঙক্তিমালা।

কাব্যিক নান্দনিকতায়
নেশার পেয়ালা হাতে মন্দিরের প্রিয়া
দাঁড়িয়ে আছে সেই কবে থেকে।

কপালে অঙ্কিত প্রতিটি বর্ণ শব্দ
সেজেছে উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলোয়।

সব সবুজ কালো হয়ে
লুকিয়েছিলো মেঘের আড়ালে
কিন্তু দিগন্তকে ছিনিয়ে এনেছি
বাংলার কাব্যিক চেতনায়।

দুরন্ত ষোড়শীর আনকোরা সুখের বাগানে
বপন করেছি দেশাত্ববোধের চারা
কাব্যময়তার নতুন ছন্দ।

 

রোদে পোড়া ঢেউ

গোধুলির লগ্ন
পূর্ণিমা দেখেনি কখনো
ঘরভোলা নারীর ঘুমন্ত স্বপ্ন
প্রকৃতির শুদ্ধ রঙে
নিজেকে সাজায়।

রোদে পোড়ে ঢেউ
শামুকে খোঁজা হাসের ব্যাকুলতায়
জলতরঙ্গ নাচে
কূল ভাঙে নদী।

বিদগ্ধ দেহের
প্রতিটি ক্ষত তামাশায় মাতে

দেহের পাঁজরে ভাঙনের স্রোত
বয়ে যায় নিরবধি।

ভাঙনের স্রোতের বাঁকে বাঁকে
জেগে ওঠে কলঙ্কের চর
তবু স্বপ্ন দেখে নদী
জীবন্ত প্রতিদিন।

পড়ন্ত বিকেলে
ক্রমশ স্বপ্নগুলো ধূসর মলিন
ভাঙনের স্বপ্ন দেখে নদী
জীবন্ত প্রতিদিন।

 

সেই স্মৃতি পড়ে মনে

জোছনা আলোকিত গভীর রজনীতে
খোলা আকাশের দিকে তাকালে
সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

ঝাঁঝালো মিছিল তীব্র শ্লোগান
স্বাধীনতার উড্ডীন পতাকা
গোলাগুলির শব্দ বারুদের গন্ধ
বাস লঞ্চ ট্রাকের গতিবেগ দেখলে
আজও সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

আধুনিকতায় গা ভাসানো উল্লাস
কম্পিত রূপ চতুর্দিকের ত্রাস
মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্য পেল-হ্রাস
কোর্ট কাচারিতে এখনো
ইংরেজির ব্যবহার দেখলে
আজও সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

ঘুষখোর অফিসার অত্যাচারী মহাজন
মদ ভাঙ গাঁজার ব্যবসায়ী কলুর বলদ
মিথ্যোবাদী রাজনীতিবিদদের দেখলে
সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

শস্যে ভরা ধান-কাউনের মাঠ পাহাড়ের চূড়া
প্রেমিকার গাল ফুলানো মুখ
মায়ের অশ্রুসিক্ত চোখ
মানবতাহীন লোকদের দেখলে
সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

নিরবতা ভঙ্গকারী ঝিঁঝি পোকার শব্দে
চিল-শালিকের ডানার ঝাপটায়
শৃগালের ডাকে বন জঙ্গলে
বিচরিত পাখিদের দেখে
সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

খেয়াপারের যাত্রী দাঁড়টানা মাঝি
গাড়োয়ানের চলার মনোবল
অথৈ জলরাশি ওপারের স্বাধীনচেতা
যুবককে দেখে
আজও সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

নদীর কূলভাঙ্গা গর্জনে
শালবনের মৃদুমন্দ হাওয়ার দোলায়
কালবৈশাখী প্রবল ঝড়ের দাপটে
বিদ্যুৎ ঝলসানো তীব্র আলোকে
সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

মেশিনের ঝকঝক শব্দ অপাত্রে জল ঢালা
বিচারকে হাতের কলম বীণার ঝঙ্কার
বিজয়েমেলার বিচিত্র দৃশ্য
পত্রিকার পাতা খুললে
আও সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

বাংলার পাগল করা প্রকৃতি
কৃষকের কাঁধে লাঙল জোয়াল
মিলকর্মচারির পরনে চটের পোশাক
পাজেরো গাড়িতে সাহেবসোবা
ভূখা নাঙা মানুষ শেরাটন হোটেল
রেডিওর সংবাদ শুনলে
আজও সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

ঘুমের ঘোরে জনতার ভিড়ে বটের মেলায়
সেই স্মৃতি পড়ে মনে।

 

ভূলুন্ঠিত যাপিত জীবন

অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
চিত্ত নির্বিকার
ঋলট-পালট করে দেখেছি
হৃৎপিণ্ডের কম্পনে
শুধু ভাঙ্গনের খেলা।

অমানবতার ছায়াঘেরা
মানবতার গালিচায় ঘুমন্ত ঈশ্বর
পথপরিক্রমার হস্যোউজ্জ্বল নক্ষত্র
আত্মিক আলোয় উদ্ভাসিত।

অগ্নিদগ্ধ শিশা গলে যায়
কালিনাগিনীর ক্রোধ।

কুয়াশার ঘেরাটোপে
অন্ধকার ধেয়ে আসে
বিস্তৃত তেপান্তরের মাঠ
কিংবা পলাশীর প্রান্তর।

আশান্ত উচ্ছৃংখল দেহে ক্লান্তি নামে
পরাজয়ের কালিমা উলঙ্গ নৃত্যে মাতে
জীবন সংবিধান
কখনোে ছোবল মারে
পরাবস্তবতা।

নিয়তির যাতাকলে ভূলুন্ঠিত
যাপিত জীবন
জন্ম মৃত্যুর যুগ সন্ধিক্ষণে
স্বর্গরাজ্য হাসে
হাসে তারার বাসর।

 

প্রকৃতি

গ্রাহের কক্ষপথে
মানুষ হাঁটে
লুটিয়ে পড়ে চাঁদ।

বিশ্ব বাতায়নে সাঁতার কাটে
উপগ্রহ আর স্বপ্নচোরা
রাতের আঁধার গলিয়ে
জোনাক জ্বলে
সে পথে হাঁটে বিশ্ব সভ্যতা।

শৈত্যপ্রবাহ আর নক্ষত্রের
স্বেচ্ছাচারিতা রুখতে
জনতার ঢল নামে।

প্রতিবাদী বিবেক কপালে এঁকে দেয়
মানুষের পদচিহ্ন
খেয়ালিপনার আলতায়
স্বপ্ন বাসর সাজায় প্রকৃতি
মেতে উঠে ধ্বংসের নেশায়।

মানুষ গড়তে চায় স্বপ্ন-ভুবন
কিন্তু প্রকৃতি নিজেকে বিনষ্ট করে
যেমনটি দেখেছি
রৌদ্রের প্রখরতায়
বরফখণ্ড নিঃশেষ হয়।

 

নাফ দরিয়ার মোহনা

সমুদ্রের তৃষ্ণ মিটাতে
ভূমিষ্ঠ নাফ দরিয়া
মোহনার ঘূর্ণিপাকে মাতে
মিলনের পারঙ্গমতা।

সফেন ফেনায় নাচে
লবণের উঠন্ত যৌবন
ভেজালের ভিড়ে রূপান্তরিত আঙিনায়
মিশে আছে হাজার বছরের বাঙালিয়ানা
লবণাক্ততার স্বাদ।

হৃদয়ের জমাটবাঁধা আবেগ
মায়াবী উষ্ণতায়
বরফখণ্ডের মতো নুয়ে পড়ে
পাহাড়ি ঝর্ণাধারা।

খানিকটা উঁচু-নিচু-ঢালু পাহাড়ের উচ্চাংগে
নুয়ে পড়ে ক্লান্ত আকাশ
দিগন্ত দেখেছে বিস্তৃত ছায়া
ছোট-খাটো ঢেউ
হৃদয়ে হৃদেয়ে খেলা করে
রিনিঝিনি সুরেলা তরঙ্গ।

আবেগি ঝড়ের তাণ্ডবে
মুখোমুখি দাঁড়াই
জোড়া দিতে থাকি
একে অপরের মন
আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

সমুদ্রের উদাসীনতায় মিলাতে থাকে
শৈবাল দ্বীপ
স্বল্প আয়ুর বিষাক্ত বাস্তবতা।

নির্লজ্জ ব্যাকুলতা
অস্তিত্বের উঠোনে আসন পেতে বসে
প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্যে
বিলীন হতে থাকে
যত্নে লালিত নিজের অস্তিত্ব
শুধু পড়ে থাকে দেহ
রংতুলিতে আঁকা তৈলচিত্র।

তবু ভালো লাগে
কি যে ভালো লাগে
শুধু ভালো লাগে
ভূমিষ্ঠ নাফ দরিয়ার মোহনা।

 

সীমাস্ত

হাজার বছরের বর্ণমালা ঘিরে
সীমান্ত অতন্দ্র প্রহরী
রাত জেগে বসে থাকে
সীমান্তের কোলে।

নেমাচর পাখির ফিসফাস শব্দ
চমকে ওঠে সীমান্তের কাঁটাতার
জাতিসত্তার দীক্ষা মন্ত্রে
অখণ্ড মানচিত্র
দু’পায়ে মাড়াতে চায়
ভিনদেশি আগ্রাসন।

নাগরের দৃষ্টি জুড়ে ছলনায় মায়াজাল
ভনিতার আলিঙ্গনে খুলেদেয়
বন্ধ করিডোর।

সীমান্তের বিরুদ্ধে সীমান্ত
প্রহরীর গুলিবিদ্ধ ক্ষত
রক্ত গঙ্গা নহে
ভাসে নির্যাতিতের লাশ
লাশের বুকে উলঙ্গ নৃত্য
মুচকি হাসে পরকীয়া প্রেম।

বিশ্ব বিবেক আজ কফিনে মোড়া
বালাম থানায় ঘুমন্ত মূল্যাবোধ।

শক্তির তাণ্ডবে জ্বলন্ত মশাল
পুড়তে থাকে সীমান্তের কাঁটাতার
ভৌগলিক সীমারেখা।

 

খোঁয়াড়

পছন্দের তালিকা যেন
প্রতিদিন অপছন্দ হতে থাকে
কাঙালি ভোজের নিমন্ত্রণে
ভিখারি সারিবদ্ধ লাইন।

চিন্তার সরল রেখায় যোগ হতে থাকে
জ্যামিতিক চি*****
আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ।

গ্রামীণ সারল্যে উজ্জীবিত জীবন
যেন বাঙালি বধূর জ্বলজ্বলে
সিঁথির সিঁদুর।

পশু জবাই করার ছটফটানি ছাপিয়ে শুনি
নগর জীবনের তৃষ্ণা
ক্লান্ত মানুষের ভিড়ে জাগ্রত শহর।

বন্দী খোঁয়াড়ের পশু
দিনদিন মানুষ হতে থাকে
আর মনুষা বিবেক ড্রয়িংরুমের শোপিস হয়ে
শুধু ঘর গেরস্থলীর উজ্জ্বল আলো
নাগরের কামনা-বাসনায়
বিবেক আজ শুয়োরের খোঁড়ায়
যেখানে রংধনুর তাস রং
স্বপ্নীল আলো
আঁধারের তাড়া খেয়ে
জ্বলতে থাকে জীবন্ত চিতা।

 

 

পানসে সুখ

বর্তমান অতীত হতে থাকে
ভবিষ্যৎ অন্ধকার
কাঙ্ক্ষিত সুখ দিনদিন
স্বপ্ন হয়ে যায়
স্মৃতির মন্থনে বহে কান্নার স্রোত।

আপন মানুষ পর হতে হতে
পশু বনে যায়
সকালের উষ্ণ সোনারোদ গায়ে মেখে
উঠানে দাঁড়ায় সুঠাম দেহের কাবলিওয়ালা
দেনার দায়ে খুবলে খায় হৃৎপিণ্ড।

উপোস থাকা পশু
দরিদ্রের নির্মমতায়
দিনদিন মানুষ হয়ে ওঠে
তবু অন্ধকারে বিলীন হতে থাকে
নিজস্ব আলো।

প্রসাদে বন্দী বিবেক
দুঃস্থ কুটির দেখে না
পানসে সুখের স্মৃতি নিয়ে
অনেক কষ্টে বেঁচে আছে মানুষ
দেনাগ্রস্ত ক্ষবিক্ষত দেহ
শুধু কষ্টের বৃত্তে ঘোরে ঘুমন্ত রাত।

 

বিলুপ্তি

ইদানিং সুখগুলো দুঃখ হয়ে যায়
দুঃখ কখনই সুক হতে চায় না
রৌদ্র¯্নানে পাটের ডগা
সবুজ হয়ে ওঠে
আর পাপিষ্ঠ দেহ
পোড়া রুটির মতো বিদগ্ধ
প্যারাবন ঝাউবন হতে হতে
ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে
তবু কবিতা হয়ে ওঠে না
হয়ে উঠে এলোমেলো কিছু পঙক্তিমালা
ভগ্ন দেহ।

বৈষ্ণবীর উছন্ত যৌবন
সব সুন্দর প্রতিদিন আড্ডায় মাতে
পাঁজর ভাঙার মর্মভেদী গানে
কষ্ট ফেরি করে গায়ের কৃষক
কৃষকের ঐতিহ্য যাদু ঘরে ঢোকে না
ঢুকে বিলুপ্তির অন্ধ কুটিরে
এখানেই তো আমার কষ্টেরা
সুখ স্মৃতির মতো কৃষিপণ্য
জমাটবাঁধা অন্ধকার
ধূসর মলিন কিংবা রুপসী লাশ।

- Advertisement -
- Advertisement -