ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০টি। কোনো দল বা জোট যদি সরকার গঠন করতে চায়, তাহলে এই ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টিতে জয় পেতে হবে সেই দল বা জোটকে। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোট এবং সাবেক ইসরায়েলি সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের রাজনৈতিক দল ইয়াশারের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি দলগুলোর জোট। ইসরায়েলি আরব দলগুলোও নির্বাচনের সময় এ দুই জোটের কোনোটিতেই যায়নি আরব দলগুলো।
নির্বাচন কমিশনের ফলাফল বলছে, নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩ আসনে এবং আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি আসনে জয় পেয়েছে। অর্থাৎ কোনো জোটই সরকার গঠন করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যক আসনে জয় পায়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার যখন ভোটগণনা চলছিল, ঠিক সে সময়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল ‘লিকুদ’ এবং তাদের সাথে যুক্ত গণমাধ্যমগুলো অভিযোগ তোলে যে, দুই ইসরায়েলি আরব দল—‘জয়েন্ট লিস্ট’ এবং ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ (রা’আম) নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় সম্ভবত বিদেশি সহায়তাও ছিল।
লিকুদ পার্টির অভিযোগ, কথিত এই হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ‘ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেটের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, ইসরায়েলকে ইসলামীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
নেতানিয়াহুর দল দাবি করেছে যে, কিছু এলাকায় ‘রা’আম’ দলের ব্যালট পেপারের সাথে খামের ভেতর নগদ অর্থ ভরে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, ভোটগ্রহণ কমিটির সদস্যদের হুমকি ও তাদের ওপর সহিংসতার অভিযোগও উঠেছে।
ভোটারদের সংগঠিত করতে নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করার অভিযোগও এনেছে লিকুদ পার্টি। তারা এই ঘটনার একটি ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত’ দাবি করেছে এবং নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে অবিলম্বে জবাব চেয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি লিকুদ পার্টি। পাশাপাশি, যদিও লিকুদ দল সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেনি, কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে নেতানিয়াহুর দলের সদস্যরা কাতার ও তুরস্ককে এই হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করছেন।
এমন অভিযোগও উঠেছে যে, ‘রা’আম’ দল ভোট কেনার জন্য কাতার থেকে অর্থ পেয়েছে। লিকুদ পার্টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছে, “ ‘রা’আম-গেট’ কেলেঙ্কারি একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের মতো। ইসরায়েলের নির্বাচন চুরি করা হয়েছে!”
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের একাংশ সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে, এই অর্থায়নের উৎস হতে পারে কাতার ও তুরস্ক। অভিযোগ, অবৈধ উপায় প্রাপ্ত এ অর্থ আরব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোট প্রদানের হার বাড়ানোর জন্যই ব্যবহার করা হয়েছে।
ভোট কারচুপির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের সন্দেহের বিষয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।
ইসরায়েলের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ একটি চিঠির মাধ্যমে তদন্তের আহ্বান জানানোর পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চিঠিতে সোলবার্গ লেখেন, “ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী বাইরের পক্ষগুলোর অর্থায়নের মাধ্যমে নির্বাচনে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করেছে— এমন কিছু গুরুতর অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য কি-না, সে সম্পর্কে আমি এখনও নিশ্চিত নই।”
এদিকে, ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। কমিটির সদস্য ও রাজনৈতিক দল ইয়েশ আতিদের সংসদ সদস্য ভ্লাদিমির বেলিয়াককে লেখা এক চিঠিতে লিভনে জানান, “নেসেট নির্বাচন আইন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়েছিল। আমাদের জানা মতে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।”
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের পাল্টা অভিযোগ:
লিকুদ পার্টির সদস্যদের আনা অভিযোগের প্রেক্ষিতে, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট বলেছেন, “লিকুদ পার্টি নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা করছে। তারা এমনটা করছে, কারণ তারা হেরে গেছে।”
আইজেনকোট আরও বলেন, “নেতানিয়াহু মিথ্যাচার, জনমতকে প্রভাবিত করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি এবং তার সহযোগীরা মিলে ইসরায়েলি জনগণের ওপর একটি অবৈধ প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রম চালাচ্ছেন।”
আরব দলগুলোও এই দাবি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ‘জয়েন্ট লিস্ট’ জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশি অর্থায়ন, সফটওয়্যার ব্যবাহর, ভোট কেনা ইত্যাদি অভিযোগ ভিত্তিহীন। এক বিবৃতিতে জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, “নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করা ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জঘন্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের বিপরীতে আর কোনো ক্ষমা চাওয়া বা নিজেদের সাফাই গাওয়ার প্রয়োজন নেই।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “এসব বর্ণবাদী অভিযোগ কেবল এটাই প্রমাণ করে যে তারা আমাদের সম্প্রদায়ের শক্তিকে কতটা ভয় পায়।”
বিরোধী দলের নেতা ইয়াইর গোলানও মন্তব্য করেছেন, “নেতানিয়াহু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, অথচ তিনি ভোটারদের রায় মেনে নিতে অস্বীকার করছেন।”
কাতার ও তুরস্কের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান :
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিকের রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য কাতারকে যেন বলির পাঁঠা বানানো না হয়।”
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, ইসরায়েলি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা কিংবা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করার অভিযোগ কাতার দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ আল-আনসারি লিখেছেন, “আমরা কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিক ও গণমাধ্যমে তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি। তারা আবারও একটি অপপ্রচারমূলক প্রচারণা শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো—কাতারকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে টেনে আনা।”
তিনি আরও লেখেন, “তারা অভিযোগ করছে যে, কাতার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের বামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং সর্বশেষ এই প্রচারণায় ‘আরব ভোট’—সবকিছুই কিনে নিয়েছে! তাদের এসব দাবি যদি সত্যি হতো, তবে তো মনে হতো পুরো ইসরায়েলই এখন কাতারের মালিকানাধীন!”
তুরস্কও ইসরায়েলি নির্বাচনে তাদের হস্তক্ষেপের দাবিকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” বলে অভিহিত করেছে।
তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তরের অপপ্রচার মোকাবিলা কেন্দ্র (সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিসইনফরমেশন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এনসোশ্যালে জানিয়েছে, “এসব অভিযোগ একটি সুপরিকল্পিত ও স্পষ্ট অপপ্রচারের অংশ, যার লক্ষ্য হলো জনমতকে প্রভাবিত বা বিভ্রান্ত করা।”
আলোকিত প্রতিদিন /৩০ অক্টোবর /২০২৬/মওম

