ঢাকা জেলা প্রতিনিধি:মামুন আহমেদ জয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে কোচিং করানোর অভিযোগ উঠেছে ঢাকার ধামরাইয়ের পাঠানটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। শুধু কোচিং করানোই নয়, কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ—বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওই কোচিংয়ে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয়। কোচিংয়ে না গেলে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া কিংবা ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিভাবকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া গেছে কোচিং করানোর চিত্রও। ধামরাই পৌর শহরের বাগনগর-পাঠানটোলা এলাকায় আল-আরাফাত ইমপিরিয়াল পাবলিক স্কুলের একটি স্থানে বিদ্যালয় ছুটির পর পাঠানটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকাকে শিক্ষার্থীদের পড়াতে দেখা যায়। অনুসন্ধানের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কোচিংয়ের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কোচিং কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে সেখানে থাকা এক শিক্ষক বলেন, “স্কুল ছুটির পর কোচিং করানো যাবে। এ বিষয়ে কোনো নিষেধ নেই।”
তবে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাণিজ্যিকভাবে কোচিং করাতে পারবেন কি না এবং যে বিদ্যালয়ে তাঁরা শিক্ষকতা করেন, সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই ব্যক্তিগত কোচিংয়ে যুক্ত করা হচ্ছে কি না—তা নিয়ে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে অংশ নিতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধান শিক্ষিকার অভিযোগ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সামান্তা খান অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি কোনো কোচিং কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নন। বরং তাঁর অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে। এর প্রভাবে অতীতেও কয়েকজন প্রধান শিক্ষক স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে দাবি তাঁর।
সামান্তা খান বলেন, ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন ধরনের চাপ ও অসহযোগিতার মুখে পড়ছেন। এমনকি বদলি হয়ে আসা একজন শিক্ষককে বিদ্যালয়ে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
কোচিং কার্যক্রমের বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, “আমি কোনো কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত নই। বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক—রোমেনা পারভীন, আব্দুল ওহাব ও আব্দুল আওয়ালসহ আরও কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে কোচিং পরিচালনা করছেন।”
তবে প্রধান শিক্ষিকার এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সবগুলো বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অভিভাবকদের প্রশ্ন, অভিভাবকদের কয়েকজনের ভাষ্য, সন্তানকে বিদ্যালয়ে পড়ানোর পরও একই শিক্ষকের কাছে আলাদাভাবে কোচিং করাতে হলে তাঁদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যদি পরীক্ষার নম্বর বা ফলাফল নিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষকের কাছে সন্তান পড়বে কি না—এ সিদ্ধান্ত অভিভাবকের হওয়া উচিত। বিদ্যালয়ের শিক্ষক যদি নিজের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোচিংয়ে যুক্ত করতে চাপ দেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।
তবে অভিযোগকারী অভিভাবকদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তাঁদের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণও এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
তদন্তের আশ্বাস শিক্ষা কর্মকর্তার,বিষয়টি নিয়ে ধামরাই উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা পলি রাণী সরকারের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বলেন, “সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে কেউ কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শিক্ষা কর্মকর্তার এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে—পাঠানটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে শিক্ষা বিভাগ কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত করবে কি না।
সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয়। তবে কোনো শিক্ষক নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোচিংয়ে পড়াচ্ছেন কি না, শিক্ষার্থীদের ওপর কোচিংয়ের জন্য কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না এবং কোচিংয়ের সঙ্গে বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন বা পরীক্ষার ফলাফলের কোনো সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

