এস কে সিরাজ, শ্যামনগর,সাতক্ষীরা। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ১১নং পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চাউলখোলা গ্রামে আজও নির্মাণ হয়নি একটি ইটের সড়ক। গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা কাঁচা মাটির রাস্তা। বর্ষায় কাদা আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালির মধ্য দিয়েই যুগের পর যুগ যাতায়াত করছেন এখানকার মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গ্রামটি উন্নয়নবঞ্চিত। একদিকে কপোতাক্ষ নদের ভাঙনে অনেক পরিবারের বসতভিটা বিলীন হয়েছে, অন্যদিকে যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাসহ নানা কারণে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে গ্রামটিতে প্রায় শতাধিক পরিবার বসবাস করলেও চলাচলের উপযোগী স্থায়ী সড়কব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামের বিদ্যমান কাঁচা রাস্তাগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন স্থানে রাস্তার দুই পাশ ভেঙে সরু হয়ে গেছে। মাছের ঘেরে নদীর লবণপানি ওঠানো-নামানোর কারণে রাস্তার ক্ষয় আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। সরকারি রাস্তা ব্যবহার করে বছরের পর বছর মাছ চাষ করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতে সংশ্লিষ্ট ঘের মালিকদের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রায়হানুল ইসলাম (রাহাত) বলেন,
চাউলখোলা গ্রামে বর্তমানে প্রায় শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। অথচ পুরো গ্রামে একটি ইটের রাস্তাও নেই। যে কাঁচা মাটির রাস্তাগুলো রয়েছে, সেগুলোও অনেক জায়গায় ভেঙে প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীর লবণপানি ব্যবহার করে মাছের ঘের পরিচালনার প্রভাবেও রাস্তার দুই পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বছরের পর বছর সরকারি রাস্তা ব্যবহার করা হলেও সেগুলো রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা বড় কোনো দাবি করছি না। অন্তত মানুষের স্বাভাবিক চলাচল, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া এবং অসুস্থ রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো ন্যূনতম যোগাযোগব্যবস্থা চাই। স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ—চাউলখোলা গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ সরেজমিনে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
আরেক বাসিন্দা ছকিনা খাতুন বলেন, বর্ষাকালে আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। রাস্তা কাদায় ভরে যায়। অনেক সময় বাড়ি থেকে স্কুলে পৌঁছানোর আগেই কাদামাটিতে পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। তাই কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে সঙ্গে অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে বের হতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই চলাচলের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দা গোপাল মন্ডল বলেন, আমার বয়স এখন প্রায় ৬০ বছর। স্বাধীনতার আগের সময় থেকে এই এলাকায় বসবাস করছি। এত বছরেও আমাদের গ্রামের একটি রাস্তাকে ইটের রাস্তা হতে দেখলাম না। জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচনের সময় নানা আশ্বাস দেন, কিন্তু আমাদের গ্রামের রাস্তার অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয় না। আমরা জীবদ্দশায় অন্তত গ্রামের একটি ভালো রাস্তা দেখে যেতে চাই।
চাউলখোলা জামে মসজিদের ইমাম বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামের মসজিদে ইমামতি করছি। রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে বর্ষার সময় অনেক দিন ঠিক সময়ে মসজিদে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু আমি নই, মুসল্লিসহ গ্রামের সব মানুষকেই প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আমরা চাই, অন্তত গ্রামের প্রধান রাস্তাগুলো দ্রুত চলাচলের উপযোগী করা হোক।
এ বিষয়ে ১১নং পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আমজাদুল ইসলাম বলেন, চাউলখোলা গ্রামের রাস্তার জন্য আমার কাছে আলাদা কোনো পর্যাপ্ত বরাদ্দ আসেনি। ইউনিয়নে যে বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা বিভিন্ন এলাকার প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজে ব্যয় হয়ে যায়। পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাওয়া গেলে চাউলখোলার রাস্তার উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, উপকূলীয় ও নদীভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের জীবন এমনিতেই প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে চলে। এর সঙ্গে যদি ন্যূনতম যোগাযোগব্যবস্থাও না থাকে, তাহলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সবকিছুই বাধাগ্রস্ত হয়।
তাই দ্রুত সরেজমিনে চাউলখোলা গ্রামের সড়কগুলোর অবস্থা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি অন্তত প্রধান কাঁচা রাস্তাগুলো ইটের সোলিং বা টেকসইভাবে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

