আজ , ।   

প্রাচীন নগর সভ্যতার ধ্বংসস্তুপ দেয়াঙ কারাগার, এই কারাগারে বন্দী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের কবি আলাওল

আরো খবর

এম জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম। ফতেয়াবাদ পরগণার অধিপতি মজলিস কুতুবের আমার্ত্য ছিলেন মহাকবি আলাওলের পিতা । ১৬১৩ সালের কোন এক সময়ে তিনি পিতার সাথে নৌকাযোগে যাএা করেছিলেন। সে সময় কর্নফুলি নদীর পূর্ব উপকুলে দেয়াঙ পাহাড়কে কেন্দ্র করে পর্তুগীজদের ঐতিহাসিক বন্দর ছিল। জলদস্যুরা উপকুলীয় বসতি থেকে মানুষকে ধরে এনে দাস হিসাবে বিক্রি করতো। ধৃত বন্দিদের ক্রীতদাস হিসাবে আরাকানেও বিক্রি করতো ।

চট্টল গবেষক জামাল উদ্দিনের গবেষণামূলক গ্রন্থ “দেয়াঙ পরগনার ইতিহাস ‘আদিকাল’ সূত্রে জানা যায়, কবি আলাওল পিতার সাথ নৌকাযোগ যাএাকালে পর্তুগীজ জলদস্যুদের কবলে পড়ে। পিতা দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ করে নিহত হয়। পর্তুগীজদের হাতে বন্দি হন কবি আলাওল । আলাওল পর্তুগীজ জলদস্যুর হাতে বন্দি হয়ে প্রথমে দেয়াঙে আনীত হন এবং আরাকান রাজদরবারে প্রেরন পর্যন্ত কবি দেয়াঙ কারাগারেই বন্দি ছিলেন। কবির পিতা নিহত হবার পর লুন্ঠিত ধনরত্নের সঙ্গে কবিকে অপহরন করে হার্মাদ দস্যুরা দেয়াঙ-এ বন্দী করে রাখে এবং কিছুদিন পর কবিকে ক্রীতদাস হিসেবে আরাকানে পাঠিয়ে দেয়। আলাওলকে পাহাড়ের ঢালু চত্বরে গোলাম বিক্রির হাটে, নিলামওলা, ক্রেতা, সাঁওতাল তরুণ -তরুণীদের সঙ্গে হাজির করেন।

একজন উর্দিপরা ব্যক্তি (সৈনিক) নিলামওলাদের নিকট থেকে কবিকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো। বার্মার রোসাঙ্গে পৌছানোর পূর্বে কবি যথেষ্ঠ নির্যাতন, দূঃখ, কষ্ট ভোগ করেছিলেন। তাছাড়া ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খাঁর সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁর নেতৃত্বে মোঘল কতৃক চট্রগ্রাম বিজয়কালে মোঘল ও আরাকানিদের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। আন্দরকিল্লা দূর্গ দখলের পর মোঘল বাহিনী কর্নফুলির পূর্ব দক্ষিন পাড়ে দেয়াঙ দূর্গ আক্রমন করে। আরাকানিদের অস্ত্র ভান্ডার ছিল এই দূর্গে। দেয়াঙ দূর্গে ভয়াবহ যুদ্ধ চলাকালে দেয়াঙ কারাগার ভেঙ্গে মুসলিম বন্দীরা বেরিয়ে আসে। কারামুক্ত মুসলিম বন্দীরা মোঘল বাহিনীর সাথে যুদ্ধে সামিল হয়। মূলত এ বন্দীরাই মগদের ধাওয়া করে, মগ সেনাপতিকে হত্যা করে দুটি হাতি কেড়ে নিয়ে মোঘল সেনাপতি ইবনে হোসেনের হাতে হস্তান্তর করেন।

মোঘল আক্রমনে দেয়াঙ বন্দরে ১৫৫ টি রনতরীর মধ্যে ২০ টি কর্নফুলি নদীতে ডুবে যায়, ১৩৫ টি মোঘল বাহিনীর দখলে চলে আসে। এই ভয়াবহ যুদ্ধে ব্যাপক হতাহত হয়, মগেরা শঙ্খ নদী পাড়ি দিয়ে দক্ষিনে চলে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে- এ যুদ্ধে প্রাচীন সেই দেয়াঙ বন্দর ও শহরের অস্তিত্ব সমূলে বিনাশ হয়ে উওরে শহর গড়ে উঠে, আজকের চট্রগ্রাম শহর ।

মরিয়ম আশ্রম : মরিয়ম আশ্রম- মা মারিয়ার তীর্থস্থান এবং বন্দর শহর দেয়াঙ রাজ্যের প্রাচীন দেয়াঙ কারাগার। বর্তমানে কারাগারটি খৃষ্টান শহীদদের সমাধি- প্রায় ছয়শো খ্রিস্টান বন্দীদের গণকবর। নবী হযরত ঈসা (আঃ)-এর মা’র নাম বিবি মরিয়ম। বিবি মরিয়মকে খৃষ্টানরা বলে মা-মারীয়া (মাতামেরী)। মা- মারীয়ার নামানুসারেই এই খৃষ্টান পল্লীর নাম ‘মরিয়ম আশ্রম’। ১৬০২ সালে আরাকান রাজার নির্দেশে মগ জলদস্যুরা এই দেয়াঙ কারাগারে বন্দী খৃষ্টান ধর্মযাজক ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্ডেসকে হত্যা করেছিল।

ফ্রান্সেসকো তৎকালীন সময়ে ঐশীবাণী( খ্রিষ্টবাণী) প্রচারের জন্য সূদুর স্পেন থেকে দেয়াঙ রাজ্যে এসেছিলেন। এ বিষয়ে মরিয়ম আশ্রমের ফাদার জাস্টিন থমাস বলেন, মা মারিয়ার আশ্রমটি (মরিয়ম আশ্রম) খৃষ্টান ধর্মালম্বীদের উপসনালয়। তিনি বলেন, এটি প্রাচীন মানব সভ্যতার একটি নিদর্শন। দেশ- বিদেশের খৃষ্টান ধর্মভীরুরা প্রতিবছর এখানে প্রার্থনা করতে আসেন।

আলোকিত প্রতিদিন/এপি

মহাকবি আলাওল স্মৃতিবিজড়িত ধ্বংসস্তূপ দেয়াঙ কারাগারটি বর্তমানে ৬০০ খিস্ট্রান বন্দীর গণকবর।

- Advertisement -
- Advertisement -