এমএইচ চৌধুরীঃ
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো ও গ্রামীণ জীবিকা উন্নয়নে ১১২ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প চালু করেছে বাংলাদেশ সরকার। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও ডেনমার্ক সরকারের অংশীদারত্বে জলবায়ু সহনশীলতা ও জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্প (ক্র্যালেপ) বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পটি বন্যাপ্রবণ হাওর ও খরাপ্রবণ উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে কাজ করবে।
ছয় বছরে ৩৩টি উপজেলায় প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষকে উপকারভোগী করার লক্ষ্য প্রকল্পটি চালু করেন বর্তমান সরকার। হাওরে আকস্মিক বন্যায় মাঠের ফসল নষ্ট হয় এবং এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের সাথে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা ও পানির সংকট কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, জীবিকার বিকল্প সুযোগ ও জলবায়ু তথ্যসেবার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করবে ক্র্যালেপ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উইং চিফ মোসলেমা নাজনীন বলেন, ‘গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস, জীবিকা শক্তিশালী করা এবং সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার ও ইফাদের উন্নয়ন অংশীদারত্ব চলে আসছে। প্রকল্পের সাফল্য শুধু ব্যয় বা নির্মাণকাজের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, মানুষ আগের চেয়ে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সুরক্ষা পাচ্ছে কি না, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে কি না এবং জলবায়ুজনিত অভিঘাত মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা বাড়ছে কি না।’ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ সড়ক, বাজার ও নৌযান ভেড়ানোর ঘাট উন্নত করা হবে, যাতে মানুষ সহজে সেবা নিতে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারে। হাওর অঞ্চলে হাঁটার পথ, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা, মানুষ ও কাটা ফসলের জন্য উঁচু আশ্রয়স্থল এবং ভাঙন থেকে গ্রাম রক্ষায় প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলায়ও সহায়তা দেওয়া হবে।
এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমরা অবকাঠামো, কৃষি, জীবিকা ও জলবায়ু তথ্যকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখছি না। এগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ু সহনশীল সড়ক বাজারে যাতায়াত সহজ করে। বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়লে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়। দক্ষতা উন্নয়নে কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বাড়ে। আর জলবায়ু তথ্য মানুষকে আগাম ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করে।’
প্রকল্পটি তরুণ তরুণী, নারী, পুরুষদের কারিগরি ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেবে। শ্রমিক চুক্তিভিত্তিক দলগুলোর মাধ্যমে দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানেও সহায়তা করবে। হাওরে আকস্মিক বন্যার আগাম সতর্কতা এবং উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার পূর্বাভাস স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জলবায়ু ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নে জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতি ও নতুন উদ্যোগ প্রয়োগে এলজিইডির সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ১১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইফাদের অর্থায়ন ৭০ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ৩১.৭৫ মিলিয়ন ডলার এবং ডেনমার্ক সরকারের অনুদান ১০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাসের উপপ্রধান অ্যান্ডার্স বি. কার্লসেন বলেন, ‘প্রকল্পের আওতাভুক্ত দুটি অঞ্চল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং জলবায়ুজনিত অভিঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু সহনশীলতা ও জীবিকা উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কমবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বাড়বে বলে আমরা আশা করি।’
বাংলাদেশে ইফাদের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও প্রতিনিধি ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো বলেন, ‘পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠলে মানুষ আয় করতে এবং প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারছে কি না, জলবায়ু সহনশীলতার প্রকৃত অর্থ সেখানেই। ক্র্যালেপ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ, তথ্য ও দক্ষতায় বিনিয়োগ করছে, যাতে তারা জলবায়ুজনিত অভিঘাতের জন্য প্রস্তুত হতে এবং জীবিকা টিকিয়ে রাখতে পারে। এলজিইডির সঙ্গে কাজ করে আমরা চাই, এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো পরিকল্পনা ও নির্মাণেও কাজে লাগুক।’
সড়ক, বাজার ও গ্রাম সুরক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগে মানুষের প্রবেশাধিকার আরও নির্ভরযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যা ও ভাঙনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি ও দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন কমবে। আকস্মিক বন্যা ও খরার আগাম সতর্কতা পরিবারগুলোকে ফসল ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষায় সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
প্রকল্পটি তরুণ জনগোষ্ঠী ও দরিদ্র নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করবে বলেও আশা করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারগুলো আয় আরও স্থিতিশীল করতে, জলবায়ুজনিত অভিঘাত কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও জীবিকা বজায় রাখতে পারবে বলে জানান অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা।
আলোকিত প্রতিদিন /২৭ সেপ্টেম্বর/২০২৬/মওম

