নিজস্ব প্রতিবেদক :
তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও হালাল শিল্পসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (কেসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বিজনেস ফোরাম: ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মালয়েশিয়া সফররত বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সৌজন্যে এ ব্যবসায়িক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন এসএমই কর্পোরেশন মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান ট্যাং চ্যাং খিম।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বারের সভাপতি জেফরি তান বলেন, মালয়েশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সমুদ্রবন্দর ক্ল্যাংয়ে উন্নত লজিস্টিক সুবিধা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মালয়েশিয়া, বিশেষ করে ক্ল্যাংয়ে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করা উচিত।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বর্তমানে শ্রমঘন শিল্প থেকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা এ দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।
বিনিয়োগের আহ্বান ডিসিসিআই সভাপতির
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়াতে দুই দেশের বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনৈতিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান দেশ। একই সঙ্গে সেবা ও উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময়।
আসিয়ান অঞ্চলের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশিরা প্রতিবছর চিকিৎসাসেবার জন্য বিদেশে প্রায় ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেন। এ সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে মালয়েশিয়ার চিকিৎসা খাতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে আধুনিক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন।
২০২৭ সালের মধ্যে এফটিএর প্রত্যাশা
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মানজুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ শুধু জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেই নয়, বিদেশি বিনিয়োগের জন্যও সম্ভাবনাময়।
তিনি বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম বড় বাধা হলো কোনো বাণিজ্য চুক্তি না থাকা। এ বিষয়ে দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
হাইকমিশনার আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর হতে পারে। এ চুক্তি হলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের এভিয়েশন, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি ও এগ্রো-প্রসেসিং খাতে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
হালাল শিল্প ও সেমিকন্ডাক্টরে সহযোগিতার আহ্বান
বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে কার্যকর হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ছাড়া সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এসএমই কর্পোরেশন মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান ট্যাং চ্যাং খিম বলেন, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১৩ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) রয়েছে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক সহযোগিতা জোরদার ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ঢাকা চেম্বার এবং ক্ল্যাং চেম্বারকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দক্ষতার সঙ্গে অংশ নিচ্ছেন এবং বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
দুই চেম্বারের মধ্যে সমঝোতা
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ. চৌধুরী।
তিনি দ্রুত এফটিএ স্বাক্ষর, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যে হালাল অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা চেম্বার ও ক্ল্যাং চেম্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ ও ক্ল্যাং চেম্বারের সভাপতি জেফরি তান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে দুই চেম্বারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৪০টি বিজনেস-টু-বিজনেস (বিটুবি) ম্যাচমেকিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটনে আগ্রহ
পরে মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতিমন্ত্রী টিয়োং কিং সিংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
সাক্ষাতে টিয়োং কিং সিং বলেন, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় ভ্রমণকারী পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। মুসলিম পর্যটন শিল্পের প্রসারে মালয়েশিয়া গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যতে আরও বেশি পর্যটক মালয়েশিয়া ভ্রমণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে মুসলিম পর্যটন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে দক্ষ জনবল তৈরি ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বমানের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি মালয়েশিয়া সরকার বিবেচনা করছে বলেও জানান তিনি।
দুই দেশের পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার (আইটিসি) মালয়েশিয়া ও ঢাকা চেম্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাবও দেন টিয়োং কিং সিং।
আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

