মামুন আহমেদ জয় : ঢাকা জেলা প্রতিনিধি। ঢাকার ধামরাইয়ে চীনা মালিকানাধীন একটি ব্যাটারি কারখানায় ঢুকে এক চীনা কর্মকর্তাকে রশি দিয়ে বেঁধে লকার থেকে নগদ ৭০ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, মুখোশ পরা অন্তত তিনজন ব্যক্তি কারখানার পেছনের টয়লেটের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে ওই কর্মকর্তার গলায় ছুরি ধরে লকারের চাবি নেয়। পরে লকার খুলে নগদ টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যায়।
শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টা থেকে রাত সোয়া ১২টার মধ্যে উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের বেলিশ্বর এলাকায় ‘জিয়াংশু স্টোরেজ ব্যাটারি বিডি কোং লিমিটেড’ নামের কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে রোববার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে ধামরাই থানা পুলিশ।
কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কারখানার ইনচার্জ ও ক্যাশিয়ার লি পেংগুই রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিজের শয়নকক্ষে ঘুমাতে যান। এর কিছুক্ষণ পর রাত সোয়া ১২টার দিকে অন্তত তিনজন ব্যক্তি কারখানার পেছনের টয়লেটের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকে। তাদের সবার মুখে মাস্ক ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কারখানায় ঢোকার পর ওই ব্যক্তিরা লি পেংগুইয়ের কক্ষে যান। সেখানে তাঁর গলায় ছুরি ধরে হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে লকারের চাবি নিয়ে লকার খুলে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে যায় তারা।
‘আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে বাথরুমের জানালা দিয়ে ঢুকে প্রথমে আমার গলায় ছুরি ধরেছে। এরপর চাবি দিতে বলে। তখন চাবি নিয়ে লকার থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে চলে গেছে। তাদের চেহারায় মাস্ক ছিল। আর আমার হাত-পা বাঁধা ছিল।’
কারখানার ম্যানেজারও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাত ১২টার দিকে বাথরুমের গ্রিল কেটে কয়েকজন ভেতরে ঢোকে। এরপর চীনা কর্মকর্তাকে হাত-পা বেঁধে গলায় ছুরি ধরে লকারের চাবি নেয়। পরে লকার খুলে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে যায়।
তবে ঘটনার বিষয়ে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিশেষ করে কারখানার লকারে এত বড় অঙ্কের নগদ টাকা কেন রাখা হয়েছিল, ওই টাকা সম্পর্কে কারা জানতেন এবং দুর্বৃত্তরা কীভাবে লকারের অবস্থান ও চাবির বিষয়ে জানতে পারল—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারখানার পেছনের অংশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। একই সঙ্গে ওই অংশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে যে পথ দিয়ে দুর্বৃত্তরা কারখানায় প্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেই অংশের কোনো ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
সিসিটিভি না থাকার কারণে ঘটনাটি তদন্তে পুলিশের সামনে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে জানালার গ্রিল কাটার ধরন, ঘটনাস্থলে থাকা আলামত, কারখানার ভেতরের গতিবিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।
তদন্তের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—ঘটনার সময় কারখানায় কারা উপস্থিত ছিলেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোথায় ছিলেন, পেছনের অংশে কেউ পাহারায় ছিল কি না এবং ঘটনার আগে বা পরে কারখানায় কারও অস্বাভাবিক চলাচল ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ ছাড়া দুর্বৃত্তরা যদি বাইরে থেকে এসে থাকে, তাহলে তারা কারখানার অবস্থান, পেছনের অরক্ষিত অংশ এবং লকারে থাকা নগদ অর্থ সম্পর্কে কীভাবে তথ্য পেল—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। আবার কারখানার ভেতরের কারও সহযোগিতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, রাত ১২টার পর সুতিপাড়া ইউনিয়নের বেলিশ্বর এলাকায় একটি ব্যাটারি কারখানার দোতলায় তিনজন দুর্বৃত্ত ঢুকে এক চীনা নাগরিককে বেঁধে লকার থেকে টাকা নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী টাকার পরিমাণ ৭০ লাখ টাকা।
ওসি বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত ও লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারে পুলিশের অভিযান চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি করা ৭০ লাখ টাকা লুটের বিষয়টিও তদন্তে যাচাই করা হবে। লকারে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ছিল, অর্থের মালিকানা ও উৎস কী এবং ঘটনার আগে বা পরে ওই অর্থের কোনো হিসাব-নিকাশ করা হয়েছিল কি না—এসব তথ্য তদন্তে উঠে আসতে পারে।
ঘটনার পর থেকে বেলিশ্বর এলাকার ওই কারখানাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রাতের বেলায় জানালার গ্রিল কেটে প্রবেশ, একজন বিদেশি কর্মকর্তাকে বেঁধে ফেলা এবং বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এটি পরিকল্পিত ডাকাতি, নাকি কারখানার ভেতরের কারও তথ্য বা সহযোগিতায় ঘটনা ঘটেছে—এখনই তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারবে বলে জানিয়েছে।
৭০ লাখ টাকা লুটের অভিযোগের এই ঘটনায় এখন পুলিশের তদন্তের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে কারখানায় প্রবেশের পথ, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা, লকারে থাকা অর্থের তথ্য কারা জানত এবং ঘটনার সঙ্গে কারও অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র ছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

