আজ , ।   

দু*র্নীতির পাহাড় সমান অভিযোগ আসিফের বিরুদ্ধে

আরো খবর

বিশেষ প্রতিনিধি :

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের কাছেই অপরিচিত ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে দ্রুতই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি।

ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আসিফ মাহমুদ। তবে দায়িত্ব পালনের সময় ইতিবাচক কাজের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিয়োগ-বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের কিছু দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

ব্যাংক হিসাব তলব, সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

গত ৪ মার্চ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব করে। এর পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেন তিনি।

আসিফ মাহমুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার নিজের নামে দুটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের একটি সঞ্চয়ী হিসাবে ছিল ৯ হাজার ৯৩০ টাকা। অপরটি ছিল সরকারে দায়িত্ব পালনের সময় খোলা বেতন-ভাতার হিসাব।

তিনি জানান, ১৬ মাসে বেতন-ভাতা এবং পাঁচটি বিদেশ সফরের টিএ-ডিএ বাবদ ওই হিসাবে অর্থ জমা হয়েছে। তার হিসাবে মোট ক্রেডিট হয়েছে ৮৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং ডেবিট হয়েছে ৭৬ লাখ ৩ হাজার টাকা। দুটি হিসাব মিলিয়ে তার কাছে ছিল ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।

তার দেওয়া তথ্যমতে, বাবা পেশায় শিক্ষক এবং তার নামে পাঁচটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এসব হিসাবে মোট ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭১১ টাকা জমা ছিল। এছাড়া তার বাবা ১০ লাখ টাকার সার্ভিস লোন নিয়েছিলেন, যার ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৬ টাকা তখনো পরিশোধ বাকি ছিল।

মায়ের একটি ব্যাংক হিসাবে ২১ হাজার ১৫৪ টাকা এবং স্ত্রীর একটি হিসাবে ৬১৩ টাকা থাকার কথাও জানান আসিফ মাহমুদ।

তবে ব্যাংক হিসাবে দেখানো অর্থের পরিমাণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের কেউ কেউ দাবি করেন, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সাধারণত ব্যাংক হিসাবে রাখা হয় না। যদিও এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

দুদকে ১১টি অভিযোগ

দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন সংস্থায় প্রকল্প, টেন্ডার, বদলি ও পদায়নসহ নানা বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়, কোনো কোনো প্রকল্পে বরাদ্দের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো। অভিযোগে আরও বলা হয়, তার কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এ ধরনের লেনদেন তদারক করতেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২. ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগে ঘুষের অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগে দাবি করা হয়, এই নিয়োগের জন্য আসিফ মাহমুদকে ১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো এবং বাকি ২ কোটি টাকা নগদে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

তবে অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে আব্দুস সালামকে পদত্যাগ করতে বলা হলে তিনি পদত্যাগ করেন।

৩. ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে লেনদেনের অভিযোগ

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

অভিযোগে বলা হয়, আসিফ মাহমুদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এ নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছিল। নগদ ২০ কোটি টাকা এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজে ১০ শতাংশ কমিশনের শর্তে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীতে মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ও সামনে আসে।

৪. স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরেও বদলি, পদায়ন ও প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগে বলা হয়, পছন্দের জায়গায় বদলি বা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে প্রকৌশলীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হতো। টেন্ডারের কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর একসঙ্গে ১৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

৫. জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও আনা হয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্পসহ কয়েকটি প্রকল্পে কাজ না করেই বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে পদোন্নতি ও পদায়নেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

৬. টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কথিত প্রেস সেক্রেটারির মাধ্যমে বিভিন্ন টেন্ডারে হস্তক্ষেপ করা হতো এবং লেনদেন চূড়ান্ত হওয়ার পরই কার্যাদেশ দেওয়া হতো।

৭. পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব ছাড়ার আগ পর্যন্ত জনপ্রশাসনের বিভিন্ন বিষয়ে আসিফ মাহমুদ হস্তক্ষেপ করতেন—এমন অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগে দাবি করা হয়, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলাভেদে ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন ও সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও তদবির-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

৮. এপিএসকে ঘিরে বিতর্ক

উপদেষ্টা হওয়ার পর মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে নিজের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদের সুপারিশের কথা বলা হয়।

পরবর্তীতে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে বলেও দাবি করা হয়।

অভিযোগ ওঠার পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি বিদেশে চলে যান বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন এবং সেখানে আসিফ মাহমুদের কথিত সম্পদ দেখভাল করছেন—এমন দাবিও রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য যাচাই পাওয়া যায়নি।

৯. পিতার প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি লাইসেন্স

আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকার সময় তার বাবা বিল্লাল হোসেনের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসরাত এন্টারপ্রাইজ’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।

গত বছরের ১৬ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হলে পরবর্তীতে লাইসেন্স বাতিল করা হয়।

১০. ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিদেশে বিনিয়োগের অভিযোগ

নিজের ও পরিবারের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর আসিফ মাহমুদের সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়, তার বিপুল অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রাখা হয়েছে এবং দুবাইয়ে সম্পদ ও বিনিয়োগ রয়েছে।

তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য ও যাচাইকৃত কোনো নথি সামনে আসেনি।

তদন্তের দাবি

প্রায় ১৮ মাস উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আসিফ মাহমুদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এবং বিচার দাবি করেছেন।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিরপেক্ষ তদন্তই এখন মূল বিষয়।

আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

- Advertisement -
- Advertisement -