এম জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি প্রত্নতাত্ত্বিক মগ মন্দিরের সন্ধান মিলেছে। প্রায় একশ ফুট গোলাকার ব্যাসার্ধের এই মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় দুশো ফুটেরও অধিক পাকা ইটের গাঁথুনিতে প্রায় ছয় ফুট প্রশস্ত দেওয়ালবিশিষ্ট এই মন্দিরের দ¶িণমুখী একটি প্রবেশপথ রয়েছে। গম্বুজ আকৃতিতে নির্মিত উক্ত মন্দিরে ব্যবহৃত ইট ও নির্মানশৈলী প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকৌশলীরা পরী¶া করে দেখতে পায় মন্দিরটির নির্মানকাল নয়শো খৃষ্টাব্দ। এতে বুঝা যায়, মন্দিরটির আনুমানিক বয়স ১১ শত বছরেরও বেশি। চট্টগ্রামে বৌদ্ধ রাজত্বকালে পরৈং নামক এক বৌদ্ধ রাজা মন্দিরটি নির্মান করেছিলেন। বৌদ্ধদের মহাজ্ঞানী মহাপ্রভু গৌতম বুদ্ধের পরই অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে চীনের মানুষরা মহাজ্ঞানী মহাপ্রভু হিসেবে মান্য করেন। চীন থেকে তিব্বত যাত্রার প্রাক্কালে ইংরেজি দশম খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অতীশ দীপঙ্কর পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন এবং তার অন্যতম গুরু নড়োপার সঙ্গে সা¶াৎ করেন। পরে সেখান থেকে পরৈকোড়ার মগ মন্দির (বৌদ্ধ বিহার) পরিদর্শনে যান। ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের জন্য মন্দিরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরের ভিতর ও বাহিরে দেওয়াল গাত্রের পরতে পরতে প্রাচীন শিল্পশৈলীতে নির্মিত অসংখ্য টেরাকোটায় পরিপূর্ণ। প্রচলিত আছে যে, ঐ মন্দিরের চুড়ায় পাঁচমন, তলায় দশমন স্বর্নের ধাতব পদার্থ রয়েছে। কথিত আছে কোনো এক দেবতার স্বপ্নদ্রষ্টা হলেই কেউ না কেউ কোনো এক সময় স্বর্নধাতবগুলো পেয়ে যাবে। সু-উচ্চ চুড়াটি নানা কারুকার্যে খচিত এবং শীর্ষে কলসি আকৃতিতে নির্মিত। চট্টল গবেষক ও ইতিহাসবিদ জামাল উদ্দিনের গবেষণা গ্রন্থ ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ থেকে আরো জানা যায়, মন্দিরশীর্ষে কলসিতে সূর্যের কিংবা চন্দ্রের আলো পড়লেই ঝলমলে আলোর বিকিরণ ঘটতো। তা বহুদূর থেকে দেখা যেত। দেশ স্বাধীনের পর স্বর্নের লোভে কে বা কাঁহারা মন্দির এলাকাটি খুঁড়ে স্বর্নের সন্ধান করতে গিয়ে মূল তলাটি নষ্ট করে দেয়। বিগত ৯/১০ বছর আগেও অনুরুপভাবে রাতের আঁধারে মন্দিরশীর্ষ চুড়াটিও একই কায়দায় ভেঙে স্বর্নের সন্ধান করে। তবে তাদের ভাগ্যে কি জুটেছে এলাকার কেউ জানেনা। সেই থেকে বর্ষাকালে ছাদ হয়ে ভিতরে পানি পড়তে পড়তে মন্দিরের সৌন্দর্য নিঃশেষ হয়ে গেছে। এমনকি মন্দিরের চতুর্দিকে লতাপাতায় ছেয়ে গেছে।
১৬৬৬ খৃষ্টাব্দে মোগল কতৃক চট্টগ্রাম বিজয়কালে মন্দিরসংলগ্ন রাজবাড়িটি পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। ১৭৬১ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ¶মতা গ্রহণের পরপর ভারতবর্ষের এক অনুচর রাজা রাজবল্লভ কানু তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে স্থানীয় মগদের বিতাড়িত করে বাড়িটি দখল করে বসবাস শুরু করেন এবং চট্টগ্রামে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অবাধ্য প্রজাদের ধরে এনে ওই মন্দিরে বলি দিতেন। ফলে মগ মন্দিরটির নাম হয়ে যায় ‘নরবলি মন্দির’। কথিত আছে ওই রাজার সাত খুন মাপ ছিল।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়ন ও তার পার্শ্ববর্তী দেয়াঙ পাহাড় এলাকাটি প্রাচীনকালে আরাকানি বা ‘মগ’ শাসনের কেন্দ্রবিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মচর্চার একটি প্রধান ¶েত্র ছিল। এই অঞ্চলের প্রাচীন মগ মন্দির এবং এর ঐতিহাসিক পটভূমি সুদীর্ঘ। ঐতিহাসিক প্রে¶াপট ও মগ শাসন১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খাঁ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের পূর্বে এই অঞ্চলটি দীর্ঘকাল ধরে আরাকানি (যাঁদের স্থানীয়ভাবে ‘মগ’ বলা হতো) এবং পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আনোয়ারা ও পরৈকোড়ার মধ্যবর্তী দেয়াঙ পাহাড়কে কেন্দ্র করে আরাকানি রাজারা তাদের সামন্ত রাজ্য ও প্রশাসনিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছিলেন। এই শাসন আমলে এখানে অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির, মঠ ও বিহার নির্মিত হয়, যা স্থানীয়ভাবে “মগ মন্দির” বা “মগ বিহার” নামে পরিচিতি পায়। পণ্ডিতবিহারের স্মৃতি ও ঝিউড়ি প্রত্নস্থল পরৈকোড়া ইউনিয়নেরই একটি বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হলো ঝিউরী গ্রাম। ইতিহাসবিদদের মতে, এই অঞ্চলটি প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। স্থাপত্য ও বর্তমান অবস্থান : প্রাচীন মগ মন্দিরগুলোর স্থাপত্য ছিল সাধারণত পাহাড়ের ঢালে বা উঁচু স্থানে পাথুরে ও পোড়ামাটির ইটের গাঁথুনিতে তৈরি। তবে ১৬৬৬ সালে মোগলদের আক্রমণের সময় অগ্নিকাণ্ড ও যুদ্ধের কারণে এবং পরবর্তীতে র¶ণাবে¶ণের অভাবে এই অঞ্চলের বহু প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে মূল প্রাচীন কাঠামোগুলো ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলেও এই অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন বিহারের মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। পরৈকোড়া জমিদার বাড়ির কাছাকাছি এবং দেয়াঙ পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এখনও এই প্রাচীন ইতিহাসের চিহ্ন পাওয়া যায়।

