আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর কাদায় ভরে যাওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলোতে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের উদ্ধারে পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নতুন পথ তৈরি করার পাশাপাশি টানেলের ভেতরে বাতাস সরবরাহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
বিবিসি নেপালির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯০০ জনের বেশি কর্মীর সঙ্গে গত বুধবারের বন্যার পর থেকে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজন টানেলের ভেতরে আটকা পড়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত জানান, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাসুওয়াগাধি, লাংটাং, চিলিমে, আপার ত্রিশুলি ৩এ ও আপার ত্রিশুলি ৩বি এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত ছিল।
ত্রিশুলি ৩এ প্রকল্প এলাকায় পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে টানেলের দিকে যাওয়ার পথ তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি ভেতরে অক্সিজেন বা বাতাস পৌঁছাতে পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা মনে করছেন, ভেতরে কেউ জীবিত থাকলে তাঁদের কাছে পৌঁছানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
নিখোঁজ প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারির স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারি স্বামীর জীবিত ফিরে আসার আশায় অপেক্ষা করছেন। ৩৩ বছর বয়সী অরুস প্রকল্প এলাকায় নিখোঁজ হন। এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯৩৯ এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা সংশোধন করে ৩ হাজার ৯২৫ জন করেছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের একটি বড় অংশ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্ধার করা মানুষের সংখ্যা ১১ হাজার ৩৭৯ জনে পৌঁছেছে বলে তিনি জানান। উদ্ধার অভিযানে নেপাল ও চীনের সামরিক সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল কাজ করছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছেন।
নিখোঁজ এক জলবিদ্যুৎকর্মীর স্ত্রী সিতা পাণ্ডে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কান্তিপুরকে বলেন, তাঁর স্বামী এখনো বেঁচে আছেন—এমন আশা তিনি পুরোপুরি হারাননি। টানেলের ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকায় তাঁর বিশ্বাস, শ্রমিকরা এখনো জীবিত থাকতে পারেন। উদ্ধারকারীরা সপ্তাহের শেষ দিকে একটি টানেলের ভেতরে বাতাস পাঠানোর কাজ শুরু করেন। তবে নিখোঁজদের স্বজনদের অভিযোগ, এই উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
সোমবার সকালে উদ্ধারকারীদের একটি দল একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে যাওয়া টানেলে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। তবে সেখানে কাউকে না পেয়ে দলটি ফিরে আসে। নিখোঁজ এক শ্রমিকের স্বজন জীবন খড়কা বলেন, সময় যত গড়াচ্ছে, তাঁদের উদ্বেগ তত বাড়ছে। তাঁর মতে, আটকে থাকা মানুষের জন্য প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেক স্বজন প্রিয়া খারেল তাঁর ভাই মিলানের সন্ধানে অপেক্ষা করছেন। বন্যার সময় মিলান ত্রিশূলী ১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রিয়া জানান, প্রকল্প থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা টানেলের ভেতরে মানুষ থাকার কথা জানিয়েছেন। তাই দ্রুত সেখানে পৌঁছানো গেলে তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।
অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করছেন। তাঁর মতে, টানেলগুলোর অবস্থান চিহ্নিত করাই বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ান’ অনুষ্ঠানে ডিক্স বলেন, টানেলগুলোর অনেক চিহ্নই বন্যায় মুছে গেছে। তাঁর ভাষায়, পুরো এলাকা এখন অনেকটা চাঁদের পৃষ্ঠের মতো দেখাচ্ছে।
তিনি জানান, প্রথমে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এরপর আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে খনন ও বড় পাথরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরি করতে হবে।
ডিক্স বলেন, ওই এলাকায় বাড়ির চেয়েও বড় আকারের পাথর রয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ অবস্থান বন্যার সরাসরি আঘাত থেকে শ্রমিকদের কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে—এ কারণে তিনি এখনো আশাবাদী। অন্যদিকে বন্যাকবলিত মূল এলাকা থেকে অনেক দূরে ভাটির দিকে চিতওয়ান জেলায় অস্থায়ীভাবে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলের নদীপথে ভেসে আসা প্রায় ৩০০ মরদেহ ওই এলাকার তীরে জমা হয়েছে।
পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবীরা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন। জেলা প্রধান কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানান, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।
পর্যাপ্ত হিমঘর বা ফ্রিজার না থাকায় অস্থায়ীভাবে মরদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনও চাপে রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতে বন্যায় সরকারি হিসাবে ১৬ জন মারা গেছেন এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে চীনে বন্যার ভিডিও ও তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অনলাইনে অনুমান বা মন্তব্য করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা, জরিমানা এবং স্বল্প সময়ের জন্য আটকের মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। নেপালেও বন্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ভুল তথ্য বা গুজব বলে মনে হওয়া অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

