এম জসিম উদ্দিন, প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার আনোয়ারা ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও দাতা সদস্য পদ নিয়ে শুরু হয়েছে চরম বিতর্ক। ১৯৭২ সালে কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য বেশির ভাগ যারা অবদান রেখেছিলেন তাদের মধ্যে আতাউর রহমান খান কায়সার (তৈলারদ্বীপ), অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান (ভিংরোল), এম এ হক (বৈরাগ), আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু (হাইলধর), নাসির উদ্দীন (তৈলারদ্বীপ), মাষ্টার আবদুল মোতালেব (শিলাইগড়া), নিত্যপ্রিয় দাশ (বোয়ালগাঁও), মাষ্টার বিনোদ রঞ্জন আইচ (খিলপাড়া), গোলামুর রহমান চৌধুরী (সৈয়দকচিয়া) দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী(সৈয়দকচিয়া), উকিল আবদুল জলিল চৌধুরী (শিলাইগড়া), জামালুছ ছত্তার (ভিংরোল), ড. নজরুল ইসলাম (ওসখাইন) শওকত হোসেন (শোলকাটা) উল্লেখযোগ্য। অর্থ ও শ্রম দিয়ে যে গুণী মানুষগুলো কলেজটি তিলে তিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেরকে দাতা সদস্যদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করে বিতর্কিত ব্যক্তি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা দেখিয়ে কলেজের প্রধান ফটকসহ কলেজের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে বোর্ড লাগানো হয়।
এতে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মাঝে দীর্ঘদিনের পূঞ্জিভুত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে কলেজটিতে। ইতিহাসবিদ জামাল উদ্দিনের গবেষণা গ্রন্থ ‘দেয়াঙ পরগনার ইতিহাস আদিকাল’ থেকে জানা যায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সর্বপ্রথম আনোয়ারা হেডকোয়ার্টারে প্রতিষ্ঠিত হয় আনোয়ারা কলেজ নামক উচ্চ বিদ্যাপীঠ। ভিংরোল গ্রামের মোহাম্মদ হোসেন খান এ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। দেয়াঙ পরগনার ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, ৬৯ সালে কোনো এক সময়ে আতাউর রহমান খাঁন কায়সার আনোয়ারায় কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি রেখেছিলেন মোহাম্মদ হোসেন খান এর কাছে। তখন তিনি ঢাকার আবুজর গিফারি কলেজে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। আতাউর রহমান খাঁন ও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান ঢাকায় বসেই প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এরপর ৬৯ গেল, ৭০ গেল, ৭১-এ দেশ স্বাধীন হল।
৭২ সালের এপ্রিলের মাঝখানে একদিন এম এন এ আতাউর রহমান খাঁন কায়সার পূনরায় অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খানকে ডেকে নিলেন তার চন্দনপুরাস্থ বাসভবনে। এখানেই সিদ্ধান্ত হল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবে। একটা উদ্বোধনী সভার আয়োজন হলো, মন্ত্রী এম আর সিদ্দিকী কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। পরে কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। এর কয়েকদিন পর এম. এন. এ. আতাউর রহমান খাঁন কায়সার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খানকে বাসায় ডেকে নিয়ে প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুও আতাউর রহমান খাঁন কায়সারের নিয়োগে সম্মতি দিলেন। এরই মধ্যে আখতারুজ্জামান বাবু, নাসির উদ্দীন, এম এ হক, মাষ্টার আবদুল মোতালেব, নিত্যপ্রিয় দাশ, মাষ্টার বিনোদ রঞ্জন আইচ, গোলামুর রহমান চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী, ড. নজরুল ইসলাম, শওকত হোসেন, পরৈকোড়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী, বটতলী এস এম আউলিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুস সোবহান কলেজের সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।
পরবর্তীতে উল্লেখিত ব্যক্তিদেরকে এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন দাতা সদস্য’হিসেবে মনোনয়ন করেন তখনকার কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কলেজ প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছর পর অর্থাৎ ২০১২ সালে কীভাবে সব প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্যদের বাদ দিয়ে নতুন করে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে প্রতিষ্ঠাতা বানানো হলো, প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এটা নিয়ে চলছে কানাঘুষা। জানা গেছে, ২০১২ সালের পরে প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্যদের অনেকের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের নাম দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মৃত বিনোদ রঞ্জন আইচ এর নাতি খিলপাড়া গ্রামের বিশ্বজিৎ আইচ রুমেল বলেন, বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি আমার পিতামহ (ঠাকুরদা) মাষ্টার বিনোদ রঞ্জন আইচ এই কলেজের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। কিন্তু কলেজের ভেতরে ও বাহিরে তার নাম কোথাও লিপিবদ্ধ না থাকায় এতে আমি ব্যথিত হয়েছি, মর্মাহত হয়েছি। কলেজের একজন প্রাক্তন ছাত্র (ব্যাচ ২০২৩) ভিংরোল গ্রামের আরিফুল ইসলাম বলেন চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদার খান বাহাদুর আবদুস ছত্তারের সন্তান জামালুছ ছাত্তার এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে একজন।
কিন্তু কলেজে এই ব্যক্তির নাম কোথাও দেখা যায়নি। আগামীতে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিলে জামালুছ ছাত্তারের নামটি লিপিবদ্ধ করবেন এই আমার প্রত্যাশা। কলেজের আরেকজন প্রাক্তন ছাত্র (ব্যাচ ১৯৯৭) পরৈকোড়া গ্রামের মাষ্টার এনামুল হক বলেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও নোংরা রাজনীতি চলছে। মাষ্টার এনাম বলেন আখতারুজ্জামার চৌধুরী বাবুসহ কলেজের সকল প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নাম জনসম্মুখে প্রচার করা হোক।
নাম প্রকাশ না করা স্বত্বে কলেজে অনার্স কোর্সে অধ্যয়নরত একজন ছাত্র বলেন বিতর্কিত বাবু পরিবারের সন্তানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দীর্ঘসময় ধরে কলেজ কর্তৃপক্ষ নানান বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে আনোয়ারা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের বিষয়ে আমার কাছে এপর্যন্ত কোনো পক্ষ আপত্তি নিয়ে আসেনি। আপত্তি নিয়ে আসলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন কলেজের কিছু আমূল পরিবর্তন ও সংস্কার নিয়ে আমরা ভাবছি। প্রিন্সিপাল বলেন, তখন প্রধান ফটকটি ভেঙে নতুন নকশায় ফটকটি করা হবে। যাতে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

