মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিছুদিন আগেও এক টেলিভিশন সাংবাদিকের সঙ্গে অসদাচরণ ও নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সমালোচনার মুখে পড়েছিল থানা কর্তৃপক্ষ। সেই ঘটনার জবাব বা দৃশ্যমান কোনো নিষ্পত্তি নিয়ে আলোচনা থামার আগেই এবার জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। ডিবি পরিচয়ে আটক, শারীরিকভাবে হেনস্তা, গলা চেপে ধরা, ‘আসামি’ বলে সম্বোধন এবং পরে থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের প্রশ্ন, একজন জাতীয় ক্রিকেটারের অভিযোগ এবং প্রাথমিক তদন্তে অপেশাদার আচরণের সত্যতা পাওয়ার পর শুধুমাত্র সাময়িক বরখাস্ত কি যথেষ্ট শাস্তি? নাকি ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন?
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার গভীর রাতে। জাতীয় দলের অফ স্পিনার নাঈম হাসান ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরেন। ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় তিনি রাত সোয়া ১১টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নগরীর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। রাত আনুমানিক ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে পৌঁছালে কয়েকজন ব্যক্তি তার গাড়ির গতিরোধ করেন।
নাঈম হাসানের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় না দিয়েই তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। একই সঙ্গে অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। তিনি কারণ জানতে চাইলে কেউ কোনো সন্তোষজনক উত্তর দেননি। বরং তাকে জোরপূর্বক অন্য একটি সিএনজিতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তার গলা চেপে ধরা হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
নাঈম দাবি করেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী একজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। ওই ব্যক্তি তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তীতে জানা যায়, ঘটনাস্থলে খুলশী থানার রাত্রীকালীন মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করছিল।
ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, তিনি বারবার নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয়পত্র দেখিয়েছেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতেও বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন চিৎকার শুরু করেন তখন আশপাশের মানুষজন এগিয়ে আসতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থলে শতাধিক মানুষ জড়ো হন। তাদের অনেকেই নাঈমকে চিনতে পারেন এবং তার সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদ জানান। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তাকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, “আমি বারবার বলেছি আমি জাতীয় দলের ক্রিকেটার। পরিচয়পত্রও দেখিয়েছি। কিন্তু তারপরও আমাকে আসামি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আমাকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। আমি জানতে চেয়েছি আমার অপরাধ কী, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি।”
নাঈম আরও বলেন, “আজ মানুষ আমাকে চিনেছে বলেই ঘটনাটি প্রকাশ্যে এসেছে। আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে হয়তো তার খোঁজই কেউ পেত না। একজন সাধারণ নাগরিক যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।” ঘটনার পর নাঈম হাসানের বাবা এবং চার নং ওয়ার্ড চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলমও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ছেলেকে থানায় নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে দ্রুত খুলশী থানায় গেলেও প্রথমদিকে তাকে থানার ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তিনি ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান।
মাহবুব আলম বলেন, “আমার ছেলে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তাকে যদি নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আমি এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।” ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ক্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব, সাবেক ও বর্তমান ক্রিকেটার এবং সাধারণ মানুষ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন পরিচিত ও আলোচিত ব্যক্তির সঙ্গে যদি এমন আচরণের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? শনিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় খুলশী থানার এসআই (নিরস্ত্র) মো. শফিকুল ইসলাম ভূইয়া এবং কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার বা দায়িত্ব পালনে অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। যেই দায়ী হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে পুরো ঘটনাটি ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে পুলিশি জবাবদিহিতা। সাময়িক বরখাস্ত প্রশাসনিক একটি প্রাথমিক ব্যবস্থা হলেও চূড়ান্ত তদন্ত শেষে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে ফৌজদারি দায়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একজন জাতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ, নাগরিক অধিকার, ক্ষমতার প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের দাবি জোরালো হলেও মাঠপর্যায়ে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন কতটা ঘটছে, নাঈম হাসানকে ঘিরে আলোচিত ঘটনাটি সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গন, সচেতন নাগরিক এবং সাধারণ মানুষের নজর তদন্তের দিকে। কারণ এই ঘটনার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেবল একজন ক্রিকেটারের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

