রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ঘিরে শতাধিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যা ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ ছড়িয়ে পড়েছে, বর্তমানে এক বড় ধরনের স্বাস্থ্যখাতের অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এখানে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার নামে চলছে অসাধু ব্যবসা, যা শুধু রোগীদের আর্থিক ক্ষতি করছে না, তাদের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
রামেক হাসপাতাল: রোগীদের জন্য শেষ ভরসা
রাজশাহীর রামেক হাসপাতাল, যা উত্তরের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী গ্রহণ করে। রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন, তবে দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা না পেয়ে চলে যান একাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এ সমস্ত ক্লিনিকগুলিতে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য দালালরা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে, সেখান থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়।
অসাধু চিকিৎসক ও দালালদের কর্মকাণ্ড
এধরনের ক্লিনিকগুলির মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে ভুল চিকিৎসার কারণে রোগী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুঠিয়ার নিরাময় ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মায়ের মৃত্যু হয়, একইভাবে ২০১৮ ও ২০২৩ সালে আরও কিছু ভুল চিকিৎসার ঘটনা ঘটে। রোগীদের এসব ক্লিনিকগুলিতে পাঠিয়ে জীবনের শেষ সময়ে তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়, যেখানে চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
দালালদের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান
রাজশাহীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একাধিকবার অভিযানে নেমে দালালদের গ্রেপ্তার করেছেন। ২০২৪ সালে র্যাব-৫ রামেক হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে যাওয়া ১০ দালালকে গ্রেপ্তার করে, যার ফলে এসব দালালদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে, এর পরও দালালদের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, যা স্পষ্ট করে যে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
অতিরিক্ত পরীক্ষার খরচ ও রোগীদের জন্য কষ্টকর পরিস্থিতি
রোগীরা প্রথমে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পেয়ে বাধ্য হয়ে একাধিক পরীক্ষার মাধ্যমে অসুস্থতার কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেন। এইসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্টের খরচ অনেক বেশি, যা রোগীদের জন্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। সরকারি হাসপাতালে যেখানে সাশ্রয়ী চিকিৎসা পাওয়া যায়, সেখানে এসব প্রতিষ্ঠানে খরচ অনেক গুণ বেড়ে যায়, যা রোগীদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা।
রাজশাহীতে ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ
রাজশাহী শহরে বর্তমানে ৩০০টির মতো ডায়াগনস্টিক সেন্টার সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনহীন বা নিয়মবহির্ভূত। রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জানাচ্ছেন, ৮০টি নতুন আবেদন আসছে, যার মধ্যে ৪০টি নতুন প্রতিষ্ঠান খুলতে যাচ্ছে। তবে, সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন যে, তারা এসব ক্লিনিকের নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন, যদিও সমস্যাটি এখনও মীমাংসিত হয়নি।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দাবি
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান এই ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছেন, যে স্বাস্থ্যখাতের এমন পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি সরকারের কাছে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি প্রস্তুত করেছেন।
উপসংহার
রাজশাহীর স্বাস্থ্যখাতে যে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্নীতি চলছে, তা রোগীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত এসব অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধির জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
আলোাকিত প্রতিদিন / এম আর এম

