আলোকিত ডেস্ক:
নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্য। বাড়ছে জীবন ধারণের অন্যান্য খরচ। কিন্তু বাড়ছে না মানুষের আয়। করোনার পর থেকে অনেকের আয় আবার কমে গেছে। চারদিকের নানা চাপে মানুষ যখন দিশাহারা তখন বিদ্যুৎ ও পানির মূল্য সমন্বয় করার তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। এতে নতুন করে আতঙ্ক ভর করেছে জনজীবনে। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে নতুন করে এসব সেবার বাড়তি মূল্য যোগ হলে মানুষ বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন- এর সরাসরি প্রভাব পড়বে জনজীবনে। সরকারি হিসাব বলছে, গত ১১ বছরে প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছে গ্যাসের দাম। একই সময়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। গত ১২ বছরে পানির দাম বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। কিন্তু এই সময়ে সেবা সংস্থাগুলোর সেবার মান খুব একটা বাড়েনি। কমেনি অনিয়ম-দুর্নীতি। এমন অবস্থায় দাম সমন্বয়ের তোড়জোড়কে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা। এদিকে এই ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে দফায় দফায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও পানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভর্তুকির ধারণা থেকে সরে এসে গ্রাহকের নতুন এক মডেলের আওতায় বিদ্যুৎ ও পানির দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের ভুলনীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর গোষ্ঠীপ্রীতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি আর পানি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়েছে। এজন্য বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এখন যদি ভর্তুকি সমন্বয় করতে গিয়ে দাম বাড়ানো হয় তাহলে জনজীবন তথা দেশের অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। এমন পরিস্থিতিতে অনিয়ম, দুর্নীতি আর অযৌক্তিক ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরলে ভর্তুকি অনেক কমে আসবে। তখন হয়তো দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে বলে তারা মনে করছেন। গত বৃহস্পতিবার একনেক সভাশেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, সরকার বিদ্যুৎ ও পানিতে সাবসিডি দেয় আর সেটার সুবিধা সবাই ভোগ করে। কিন্তু সেটা যুক্তিসঙ্গত নয়। সাবসিডি থেকে সরে আসতে হবে, এজন্য এলাকা, আয় ও পরিবার অনুযায়ী বিল নির্ধারণ করতে হবে। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মহানগর বা গ্রামীণ এলাকায় সেবাদাতা কোম্পানির ধরন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও পানির সেবামূল্যে সামান্য পার্থক্য থাকে। কিন্তু সরকার থেকে বলা হচ্ছে, এখন এসব সেবার মূল্য আয় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। সরকার গত কয়েক বছর ধরেই এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ-পানির মতো জরুরি সেবার দাম নির্ধারণের কথা বলে আসছে। অর্থাৎ যেসব এলাকার মানুষের আয় বেশি তাদের বিলও বেশি আসবে। আর যেসব এলাকায় নিম্নআয়ের মানুষ বেশি সেসব এলাকাও বিলও হবে কম। কিন্তু কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ-ক্যাব মনে করে, এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে এই পণ্যগুলোর দাম এমনিতেই অনেক বেশি। সেটা আগে কমিয়ে তারপর ট্যারিফ ঠিক করা যেতে পারে। সরকারের নতুন উদ্যোগ: গত বৃহস্পতিবার ছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে শেষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক। বৈঠকের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ ও পানির ভর্তুকি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার নির্দেশনা দেন। তার পরামর্শ হল আয় অনুযায়ী এলাকা ভিত্তিক বিদ্যুৎ ও পানির দাম নির্ধারণ করা। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে সেটাই জানিয়ে দেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, আমাদের ভর্তুকি থেকে সরে আসতে হবে। সাবসিডির উপকার সবাই ভোগ করে। যে মন্ত্রী- তিনিও সাবসিডির উপকার ভোগ করেন, আবার ক্লিনার যে (মন্ত্রীর) আবাসিক এলাকায় বসবাস করে, সেও একই রেটে নিচ্ছে। এটা তিনি (প্রধানমন্ত্রী) মনে করেন সঙ্গত নয়। এটাকে আমরা এরিয়া ভিত্তিক, পরিবার ভিত্তিক, আয় ভিত্তিক করে আমাদের চার্জ ধারণ করতে হবে। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন প্রস্তাবের কথা বলেছেন। তবে একেক এলাকায় পানির দাম একেক রকম করার কথা প্রথম প্রস্তাব করে ঢাকা ওয়াসা। ২০২০ সালে এক অনুষ্ঠানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান এ প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, পানির যা উৎপাদন খরচ হয়, তার চেয়ে আমরা অনেক কম দামে পানি দিচ্ছি। বাকি টাকা সরকার ভর্তুকি হিসাবে দেয়। দুঃখজনক হলো, এখন উচ্চবিত্তরাও সেই ভর্তুকি পাচ্ছেন। তাদের সেটা পাওয়া উচিত নয়। সব শ্রেণির মানুষের জন্য পানির দাম এক হওয়া উচিত নয়। তাই আমরা এখন চিন্তা করছি, এলাকা ভিত্তিক পানির দাম নির্ধারণ করবো। তবে সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। এছাড়া পানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে আদালতেরও নিষেধাজ্ঞা ছিল। এর দু’বছর পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামও একই কথা বলেন। তবে এখন ভর্তুকি থেকে সরে আসতে বিদ্যুৎ ও পানির এলাকাভিত্তিক বিল নির্ধারণের যে প্রস্তাব সরকার দিয়েছে সেটা আসলে কতোটা গ্রহণযোগ্য? ক্যাবের জৈষ্ঠ্য সহ সভাপতি ও জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন এটা কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মন্তব্য করেন, বিদ্যুৎ ও পানি এই দুটি সেক্টরেই ভয়াবহ উদ্বেগের জায়গা আছে। এই খাতে যেমন মামলা চলমান আছে, তেমনি আদালতের নির্দেশনাও আছে এ নিয়ে। সেগুলো না মানতে সরকারের এটি একটি কৌশল বলে মনে করেন তিনি। দেখুন এগুলোর মূল্য বৃদ্ধির করার জন্য যেমন ঘাটতি বেশি দেখানো হয়, সেভাবে সাবসিডিও বাড়ানো হয়েছে। আর এসব কিছুই করা হয় সরকারে থাকা একটা স্বার্থান্বেষী মহলের সুবিধার জন্য। এটা মোটেই ভোক্তাবান্ধব কিছু নয়। এছাড়া সরকার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে যুক্তি দিচ্ছে, সেটা নিয়েও আপত্তি এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞের। ভর্তুকি তো ভোক্তারা চায় না, ভোক্তারা চেয়েছে যে ব্যয় হচ্ছে সেটা যেন যুক্তিসঙ্গত হয়। সেই বিষয়টা নিয়ে সরকারের আগে কাজ করতে হবে। শামসুল আলম বলেন এ খাতকে জনকল্যাণমুখী করতে হলে আগে বিদ্যুৎ, পানির মতো পণ্যকে সেবা হিসেবে সরকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এই উদ্যোগ যেভাবে বাস্তবায়ন হবে: পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সংবাদ সম্মেলনে যখন এলাকাভিত্তিক বিলের প্রস্তাব তুলে ধরার সময় পরিষ্কার করে বলেন যে, এটি আজকের অর্ডার নয়, যারা এটি নিয়ে কাজ করে তাদের জন্য এটি বলা। তবে সরকার বিষয়টি বাস্তবায়নে এবার বেশ সিরিয়াস বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এই বৈঠকে ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এ কে এম ফজলুল হক। তিনি জানান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ছিল পানি এবং বিদ্যুতের অপচয় রোধ করতে একটা পলিসি বা নীতিমালা তৈরি করা। আমার ধারণা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে হয়তো এটি বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করা হবে। তবে শামসুল আলম আরো বলেন, গণশুনানি ছাড়া যাতে কোন মূল্য নির্ধারণ না হয়, আদালতের এমন আদেশ বহাল আছে। তবে গত বছর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলটরি কমিশন আইন সংশোধন করেছে সরকার। ফলে গণশুনানি ছাড়াই তেল, বিদ্যুৎ বা গ্যাসের মতো জ্বালানির দাম নির্ধারণ করতে পারছে সরকার। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের একেকেটি এলাকায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বসবাস করে। আয়ের ভিত্তিতে ভাগ করতে গেলে তাদের সবার তথ্য সংগ্রহ করে সেই অনুযায়ী আলাদা আলাদা মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। সরকারের পক্ষে সেটি সঠিকভাবে করার মতো সক্ষমতা আছে কিনা, সেই প্রশ্নও রয়েছে। ওয়াসার এমডি তাসকিম এ খান বলেন, এখন এক হাজার লিটার পানি উৎপাদনে খরচ হয় ২৫ টাকা। এই পানি ১৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। আইন অনুযায়ী, ওয়াসা পানির দাম বছরে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বাড়াতে পারে। কিন্তু এটা পর্যাপ্ত মনে না করায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় ওয়াসা। পানির দাম ও উৎপাদন খরচের ফারাক সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ভিক্ষা করে একটি সরকারি সংস্থা চলতে পারে না। প্রতি হাজার লিটারে সরকারকে ১০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এদিকে গত বছর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভায় জানানো হয়, সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) ৭০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন। এই ভর্তুকির বিপরীতে সরকারের চলতি বছরের বাজেটে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ২ হাজার কোটি টাকা জ্বালানি বিভাগকে দিয়েছে। এলএনজি আমদানি করতে সরকারের এখনই দরকার ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই বরাদ্দও যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। সে কারণে গত নভেম্বরে অর্থ বিভাগের কাছে ৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দিয়েছে তারা। এ প্রসঙ্গে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম সবার জন্য সমান। কিন্তু আয় সমান নয়। সরকার যদি নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাহলে এ বৈষম্য অনেক কমে আসবে। একই সঙ্গে এক ধরনের ভারসাম্য আসবে হয়তো। এটার একটা যৌক্তিকতা রয়েছে। নীতিগতভাবে সরকারের এ অবস্থান ঠিক আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর যাতে মূল্যবৃদ্ধির অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখে একটা মডেল তৈরি করতে হবে। ক্যালিফোর্নিয়ায় কী হচ্ছে: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটে গত বছর একটা আইন পাস হয়েছে, আর সেটা হল বাৎসরিক আয়ের ভিত্তিতে প্রতি মাসে ইলেকট্রিক ও গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হবে। এই আইনিটি কার্যকর হবার কথা আগামী বছরের জুলাই থেকে। সেদেশে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে দুটি বিষয়: মাসিক বিল নির্দিষ্ট করে ফেলা এবং ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া। তবে এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সেখানে চলছে নানা তর্ক বিতর্ক। সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়েছে কে কত বিল দেবে। যেমন যাদের আয় বছরে ২৮ হাজার ডলারের নিচে তারা প্রতি মাসে দেবে ২৪ ডলার করে। আর মাসে সর্বোচ্চ ১২৮ ডলার দেবে যাদের আয় বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা তার বেশি। কিন্তু কারা, কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে, সরকার কোন তৃতীয় পক্ষ বা এজেন্সিকে এ কাজ দেবে কি-না সেসব নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। এছাড়া শুধু ইনকাম ট্যাক্সের তথ্য দেখে বিল নির্ধারণ করা রাজনৈতিকভাবেও সেখানে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীরা এটাকে কোন সত্যিকার সমাধান বলে মানতে রাজি নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এম শামসুল আলম মনে করেন, এখানে সবক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রমাণ আছে। সরকার ট্যাক্স নিতে পারে না কিন্তু গুলশানে বাস করে বলে বিদ্যুৎ বিল বেশি নেবে এটা হাস্যকর। আয় সৎ নাকি অসৎ সেটা না দেখে কারো কাছ থেকে বেশি পয়সা নেয়া সেটা অসাধু। তিনি বলেন, যদি আগে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়, সমস্ত দুর্নীতি বন্ধ করে যদি আগে ন্যায্য দাম ঠিক করা হয়, তারপর ট্যারিফ ভাগ করা যেতে পারে এবং তখন দরকার হলে নিম্নআয়ের মানুষদের ফ্রি-তেও এসব সেবা দেয়া যেতে পারে।
আলোকিত প্রতিদিন/ ১১ নভেম্বর ২৩/ এসবি

