আজ শুক্রবার, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ।   ১৫ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঈদ এলেই জ্বলে ওঠে আগুন,বাঁচে সংসার-কিন্তু নিভে যাচ্ছে কামারদের জীবন সংগ্রাম

আরো খবর

ওয়াসিম শেখ:

টুংটাং হাতুড়ির শব্দ, হাপরের আগুন আর ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর-এসবই যেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কামারপল্লিগুলোর চিরচেনা দৃশ্য। আগুনে লাল হয়ে ওঠা লোহায় একের পর এক আঘাত করছেন বৃদ্ধ কর্মকাররা। পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই জমে উঠেছে তাদের ব্যস্ততা। কিন্তু এই ব্যস্ততার আড়ালেই লুকিয়ে আছে অভাব ও কষ্ট আর টিকে থাকার নিরন্তর যুদ্ধ।

বছরের অধিকাংশ সময় কাজের তেমন চাপ না থাকলেও কোরবানির ঈদকে ঘিরেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় কামারশালাগুলো। দা,বঁটি, ছুরি এবং চাপাতি তৈরির কাজে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের পাশে কাটছে তাদের সময়। এতো পরিশ্রমের পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত আয়।

রামগাতীর মিন্টু কামার বলেন, আগে ঈদের এক মাস আগ থেকেই অর্ডার সামলাতে পারতাম না। এখন বাজারে কারখানার তৈরি জিনিস চলে আসছে। মানুষ কম অর্ডার দেয়। লোহা, কয়লা সবকিছুর দাম বেড়েছে। সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। কথার মাঝে চোখের কোণে জল জমে ওঠে তার। জানান, বছরের ১১ মাস ঠিকমতো কাজ না থাকায় অনেক সময় ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়। ঈদের এই মৌসুমের আয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক কামারশালায় বয়স্ক কারিগররাই এখনো কাজ করছেন। কারও চোখে ঝাপসা দেখে, কারও হাতে কাঁপুনি-তবু থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। কেউ কেউ আবার শ্রমিক রেখে কাজ করাচ্ছেন, কারণ একা আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না।

সোলেমান কর্মকার বলেন, এই আগুনের পাশে কাজ করতে করতে শরীর শেষ হয়ে গেছে। ডাক্তার আগুনের কাজ কম করতে বলেছে। কিন্তু কাজ না করলে পরিবার চলবে কীভাবে? ছেলে-মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে এখনো হাতুড়ি চালাই।

কালিয়া কান্দাপাড়া এলাকা থেকে ছুরি এবং চাপাতির অর্ডার দিতে আসা হারুন বলেন, “দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু তাদের অবস্থাও খারাপ। কষ্ট করেই তো এগুলো বানায়।

কর্মকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বড় ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। চাপাতি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং দা, বঁটি ও ছোট ছুরি প্রকারভেদে ৫০০ টাকা কেজি দরে বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কামারশালার ব্যস্ততা। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখার পাশে দাঁড়িয়ে জীবন গড়া এই মানুষগুলোর চোখে এখন আনন্দের চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি। তবু পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে আগুনের উত্তাপ আর হাতুড়ির আঘাত সহ্য করেই প্রতিদিন লড়ে যাচ্ছেন সিরাজগঞ্জের এসব কর্মকার।

আলোকিত প্রতিদিন / ১৫ মে ২০২৬ /মওম

- Advertisement -
- Advertisement -