আলোকিত ডেস্ক:
আমেরিকার নির্বাচনের ট্রাম্প এর কোণ ঠাসা অবস্থা তৈরি হলো: তৈরি হলো যুদ্ধের আচ আমেরিকানদের গায়ে লেগেছে সেই জন্য। যদি ইরান যুদ্ধের কারণে দেশের ভেতরে তেলের দাম না বাড়ত, যদি দ্রব্যমুল্য ঠিক ঠাক থাকত, ট্রাম্প এবারো হাউজ আর সিনেটে ঠিকই নিজের মেজরিটি ধরে রাখতে পারতেন। এটাই আসল কথা। আটলান্টিক আর প্যসিফিকের জল পেরিয়ে আমেরিকান জনগনের গায়ে সারা বিশ্বের অনেক কিছুর আঁচ লাগে না। আমেরিকা যে সার দুনিয়ায় আকাজ-কুকাজ করে বেড়ায় এর ছিটে ফোটা লাগলেই এরা বুঝতে পারত।
কিন্তু কী করে যেন এই নির্বাচনের হালচালে মুসলিম ফ্যাক্টর মিডিয়া কাভারেজ পেল।
একজন মুসলিম সিনেটর হয়েছেন। এই খবর অনেক গুরুত্ব পেয়েছে।
১০০ জনের মধ্যে একজন মাত্র মুসলিম সিনেটর। এক শতাংশ। আমেরিকার জনসংখ্যার মুসলিমরা সাকুল্যে এমনই- ১ থেকে ১.৫%। কিন্তু আব্দুল আল সাঈদ কি এই পুরা মুসলিম জনসংখ্যাকে রিপ্রেজেন্ট করেন? না।
তিনি মিসিগান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। মিসিগানে স্পেশাল ডেমোগ্রাফি আছে। হ্যানরি ফোর্ডের সিদ্ধান্তের কারণে ঐতিহাসিকভাবে এখানে আরব মুসলিমদের আধিক্য বেশি। তিনি গাড়ি নির্মাণের জন্য ইচ্ছে করেই আরব ইমিগ্রান্টদের নিতে চাইলেন। এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে ৫০% এর অধিক মুসলিম বাস করে।। এমন জায়গা থেকে একজন যোগ্য মুসলিম নেতা নির্বাচিত হতেই পারেন। সেটাকে এত বড় করে দেখা হচ্ছে কেন?
মিডিয়া এটাকে কেন মুসলিম জনগোষ্ঠির রাজনৈতিক উত্থান হিসাবে দেখছে?
এখানেই গল্পটা লম্বা। আমাদের আরো ভেতরে ঢুকে দেখতে হবে।
এর আগে আর একটু বলে নিই। আমেরিকার এই নির্বাচনে শুধু ইন্ডিয়ান বংশদ্ভুত ছয় জন হাউজ মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের নিয়ে কিন্তু আলোচনা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে না একটা মাত্র দেশ থেকে ইমিগ্রান্ট পরিবারের ছয় জন নির্বাচিত হয়েছেন। এক সময় এরা পুরা আমেরিকাকে খেয়ে ফেলবে।
২
আমেরিকা থেকে ইউরোপের দিকে একটু তাকান।
ইউরোপে গত চার বছর ধরে ইউক্রেন যুদ্ধের ভাইরাস এমন তীব্র ভাবে আক্রমণ করেছে, ইউরোপ প্রায় পংগু হবার জোগাড়। ইউরোপে জ্বালানীর জন্য যে পরিমাণ খরচ বেড়েছে, তাতে এক ধরনের নীরব দারিদ্র্য ছড়িয়েছে। তেলের দাম স্রেফ ৫০% বেড়েছে। এটা কী সহজ কথা! আর সেটা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে গত চার বছর ধরে। অন্য দিকে নিরাপত্তার নামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ বেড়েছে। রাশিয়ান জুজুর ভয়কে পুঁজি করে এই বিনিয়োগ হয়েছে। এর উপর ইউক্রেনের রিফুজিদের চাপ তো আছেই।
চার বছর পরে দেখা যাচ্ছে মানুষের হতাশা জনবিক্ষোভ তৈরি করছে।
ফ্রান্সে গত দেড় মাস ধরে চলছে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায়। ফ্রান্সে যেটা হচ্ছে এটা যদি এশিয়ার কোন দেশে হতো, এতদিন ধরে, তাহলে সরকার পড়ে যেতো। এখানে পড়ছেন না, কারণ আন্দোলন এখানে ইস্যু ভিত্তিক। সরকার পতনের জন্য হচ্ছে না। ইস্যুগুলো খুবই স্ট্রেইট- শিক্ষার উচ্চমান এবং সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। চাকুরির সুযোগ তৈরি করতে হবে। আর দ্রব্যমুল্য ঠিক রাখতে হবে।
ফ্রান্সের এই আন্দোলন জার্মানীতে পৌঁছেছে। ইতালিতে গেছে। সামনে আরো অনেক দেশে ছড়াবে। ঠিক এই সময়ে ইউরোপের প্রায় সব দেশে ডান পন্থার উন্মেষ দেখা যাচ্ছে। ডান পন্থা মানেই মুসলিম বিদ্বেষ।
এটা মজার ব্যপার। সবাই মনে করে মুসলিমরাই বুঝি সব নাটের গুরু, এদের ঠ্যাংগাতে হবে। অথচ শিক্ষা, অর্থ, যোগ্যতা সব দিক থেকে এরা প্রায় নির্বিষ টাইপের একটা জনগোষ্ঠি ইউরোপে। এদের হাতে কাবাবের রোল ছাড়া আসলে তেমন কিছু নাই।
তাহলে এদের কেন ঠ্যাংগাতে হবে?
এরা সহজ টার্গেট তাই? নাকি হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় চিন্তা চেতনার ভেতরে ইসলাম বিদ্বেষের একটা বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসে আছে। যেটাকে সহজেই পলিটিসাইজ করা যায়, সেটার কারণেই ইসলাম বিদ্বেষ?
আমি মনে করি দ্বিতীয় কারণটাই মুল। প্রচ্ছন্ন, কিন্তু খুবই কার্যকরী।
কিন্তু ইউরোপে কি মুসলিমরা অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠি?
ড্যাটা কী বলে? ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে অনেক কিছু নিয়েই গবেষণা হয়, এটা নিয়েও হয়েছে। সারাংশ দেখি।
অপরাধ প্রবণতা মুলত ইয়াং প্রজন্মের ভেতরে বেশি। এটা নেটিভ এবং ইমিগ্রান্ট সবার বেলায় প্রযোজ্য। ড্যাটা স্ট্যাটিস্টীক্স থেকে কোন কো রিলেশান পাওয়া যায় নাই যে ইমিগ্রান্টদের বা বিশেষ করে মুসলিম ইমিগ্রান্টদের ভেতরে অপরাধ প্রবণতা বেশি।
লিগ্যাল স্ট্যাটাসে যেসব ইমিগ্রান্ট থাকেন, তাদের ভেতরে অপরাধ প্রবণতা খুবই কম। এই অপরাধের ভেতরে সবই আছে – মদ খেয়ে মাতলামো থেকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা, চুরি করা, ভাংচুর করা।
সুইডিশ গবেষণা বলছে ( ২০২৪ সালে করা), যে এলাকাগুলোতে ইমিগ্রান্টরা থাকে, যাদের একটা স্ট্যাবল ইনকাম সোর্স আছে, সেখানে অপরাধ প্রবণতা নেগেটিভ। মানে বড় কোন অপরাধ সেখানে সংঘটিত হয়না।
তাহলে?
ইউরোপের রাজনীতিকে আজকের দূরবস্থার জন্য একটা ব্যাখ্যা দিতে হবে।
কী বলবে তারা? আমরা ইউক্রেনের যুদ্ধটাকে টেনে টেনে এই অবস্থা তৈরি করেছি? রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসব না, এই ইগোকে রক্ষা করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ বাজেট খরচ করেছি? আমেরিকার চালে পা দিয়েছি, এখন ফেসে গেছি? ন্যাটো বলে আসলে কিছুই তেমন ভাবে এক্সিস্ট করছে না! কী বলবেন আপনি?
না, এই কথাগুলো বলা যায় না। বললে নিজের ফেস ভ্যালু থাকে না।
তার চেয়ে একটা ভেড়া খুঁজে এনে তার গর্দান কেটে দেয়া ভালো কাজ। এটা করতে গিয়ে ইমিগ্রান্ট, তাদের একটা অংশ মুসলিমদের সামনে আনা হয়েছে। যাতে দেখানো যায়, এরা, এই লেজির দল, এই সব আনকালচার্ড লোকগুলো আমাদের সোসাইটিকে দেশকে একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে।
৩
একই সময়ে মুসলিম ভোটাররা ভোট দিয়েছে এবার। আগে তারা ভোট কেন্দ্রে যেত না। ১৯ টি আসন পেয়েছে মুসলিম আরব পার্টি। এটাই ইসররায়লের হিসাব নিকাশ পালটে দিয়েছে। এই কারণে নেতা নেয়াহুর ক্ষমতায় আসা অসম্ভব হয়ে গেছে। মনে করা হচ্ছে মুসলিম ভোটাররা টাকা খেয়ে ভোট দিতে গেছে। কাতার এখানে টাকা ঢেলেছে। তদন্ত চলছে।
৪
আর একটা বিষয় আমাদের বুঝতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছাড়া জায়োনিজম এত বড় ধাক্কা খায় নাই। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ভেতর দিয়ে জায়োনিজম এক ধরনের আদরের পুতলার মত ইউরোপ আমেরিকার কোলে বসে ছিল। কিছু হলেই গাল ফুলিয়ে কেদে বলেছে, -আব্বু আম্মু দেখ, আমাকে মারছে। জায়োনিজমে দুইটা স্তম্ভ। বিজনেসের শক্তি। সাথে ধর্মের ব্লেন্ড।
তারা পলিটীক্যাল সিস্টেমে একধরনের মাফিয়া। গত ফিলিস্তিনের গনহত্যার পরে জায়োনিজম যে সংকটে পোড়ছে এটা আগে কখনো পড়ে নাই। আগে যেখানে ইসরায়েলকে সাপোর্ট করাই স্বভাব স্বাভাবিকতা ছিল, সেখানে এখন ইসরায়েলকে ঘৃণা করছে মানুষ।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে নির্বাচনের দিন সকালে ঘোষণা দিতে হয়েছে, ইসরায়েলকে বছরে যে অনুদান দেয়া হয়, ৩ বিলিয়ন ডলার, সেটা আর দেয়া হবে না। এটা এক বিরাট ঘোষণা। পাবলিক মেন্টালিটি কতটা ইসরায়েল বিরোধী হলে এটা হতে পারে।
ইসরায়েল বিরোধী এই মনোভাব শুধু মুসলিমদের নয়, সাধারন ভাবে বেশির ভাগ ইয়াং প্রজন্মের।
মুসলিমরা যেহেতু শুরু থেকেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, তাই সাধারণ মানুষের কাছে ইসরায়েলের এই মুখোশ উন্মোচন এক ধরনের ইসলামের জিতে যাওয়া মনে হচ্ছে। আর এটা মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। আপনি যাকে দাবায় রাখতে চান, তিনি তরতর করে মই বেয়ে উঠে যাচ্ছে। সে মরতে মরতেও বেশ কেলিয়ে হাসছে। এর চেয়ে অপমানের কি হতে পারে? ঠিক এই মনস্তত্ত্ব থেকেই নেতা নেয়াহু চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলেন, ইউরোপ আমেরিকার মুসলিমদের দেখে নিতে হবে।
সামনের দিন গুলোতে ইউরোপে তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ দেখব। এই বিদ্বেষ এমন দ্রুত বাড়ছে – ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর ফান্ডামেন্টাল রাইটস’ (এফআরএ)-এর ২০২৫ সালের মার্চ মাসের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসকারী প্রতি দুজন মুসলিমের মধ্যে প্রায় একজন (৪৭%) দৈনন্দিন জীবনে জাতিগত বা ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হন। ২০১৬ সালে এই হার ছিল ৩৯%, অর্থাৎ বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্ট্রিয়া (৭১%), জার্মানি (৬৮%) এবং ফিনল্যান্ডে (৬৩%) বৈষম্যের হার সবচেয়ে বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫
এখন কী হবে?
ইউরোপের অনেক সরকার একটা ধোয়া তুলেছে। তারা বলছে ৭২ ঘন্টার খাবার মজুদ রাখতে।
কেন?
রাশিয়া হয়ত ইউরোপব্যাপী হামলা করবে। এটা একেবারেই প্রপাগান্ডা। এর কারণ রাশিয়ার পক্ষে ইউরোপের সাথে যুদ্ধ করার কোন কারণ নাই। যে যুদ্ধে সে জিতবে না সেটা করে তার লাভ কী। ইউরোপ স্রেফ বাজার। এখানে বরং বিজনেস করতে হবে। চায়নার বড় বাজার ইউরোপ। সে কখনো চাইবে না ইউরোপ যুদ্ধ বিগ্রহে জড়াক।
তার চেয়ে ইউরোপ নিজেই সিভিল ওয়্যারে দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার হাউজ আর সিনেট দুইটাই যদিও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, তারপরেও ট্রাম্পের এডমিনিস্ট্রেটিভ পাওয়ার আছে। তার হাতে অলরেডি যে বিল গুলো পাশ করা আছে সেটা দিয়েই সে যুদ্ধ চালাতে পারবে।
সে চাইলে ইরানে হামলা করতে পারে। কিন্তু এটা নির্ভর করছে রাশিয়ার সাথে তার চুক্তির উপর।
নভেম্বরের মাঝামাঝি আমরা জানতে পারব কি হচ্ছে। নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প দুই জনই যেহেতু হারু পার্টী দুই জনের নিজেদের ইগো আর পিঠ বাচানোর জন্য একটা সর্বব্যাপী যুদ্ধ সব থেকে কার্যকর স্ট্রাটেজি।
এই মুহূর্তটা খুবই নাজুক। চোখ কান খোলা রেখে দেখি কী হয়।
মুস্তাফিজুর রহমান:
লেখক ফিনল্যাণ্ড প্রবাসী বাংলাদেশী
আলোকিত প্রতিদিন /০৮ নভেম্বর /২০২৬/মওম

