লাইফস্টাইল ডেস্ক:
পাহাড়ি রাস্তায় কখনও চড়াই, কখনও উতরাই থাকে। কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ থাকা অবস্থায় সেই রাস্তায় যদি গাড়ি নিজে থেকে ওপরের দিকে উঠতে থাকে তা হলে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক।
ভারতের লাদাখে রয়েছে এমনই এক রহস্যময় স্থান, যা পরিচিত ‘ম্যাগনেটিক হিলস’ বা চৌম্বক পাহাড় নামে। স্থানীয়দের অনেকের দাবি, এই পাহাড়ের অদৃশ্য চৌম্বক শক্তিই নাকি গাড়িকে টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু সত্যিই কি পাহাড়ের এমন ক্ষমতা রয়েছে, নাকি এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে বিজ্ঞানের অন্য কোনও ব্যাখ্যা?
লেহ শহর থেকে প্রায় ১৯ মাইল দূরে শ্রীনগর-লেহ মহাসড়কের পাশে এই রহস্যময় অঞ্চল। রাস্তার ধারে থাকা একটি সাইনবোর্ডে পর্যটকদের উদ্দেশে লেখা রয়েছে, মাধ্যাকর্ষণকে চ্যালেঞ্জ জানানো এই বিস্ময় নিজের চোখে দেখতে হলে নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি দাঁড় করাতে হবে। রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয়, সেটি পাহাড়ের দিকে ওপরের দিকে উঠে গিয়েছে। অথচ সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলে গাড়িটি নিজে থেকেই এগিয়ে যেতে শুরু করে। এই দৃশ্যই বছরের পর বছর ধরে পর্যটকদের কৌতূহল বাড়িয়ে চলেছে।
চৌম্বক শক্তি নাকি চোখের ভুল:ম্যাগনেটিক হিলসের রহস্য নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি অবশ্য অলৌকিক নয়, বরং পুরোপুরি দৃষ্টিনির্ভর। অনেকের মতে, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সেখানে এমন এক দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়, যার ফলে রাস্তা ওপরের দিকে উঠছে বলে মনে হয়। বাস্তবে রাস্তাটি ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে যায়। আশপাশের উঁচু পাহাড় দিগন্তরেখাকে আড়াল করে রাখে। ফলে রাস্তার প্রকৃত ঢাল বোঝার মতো কোনও স্পষ্ট সমতল দৃষ্টিসীমা থাকে না। এই কারণেই গাড়ি নিচের দিকে গড়িয়ে গেলেও মনে হয়, সেটি যেন নিজের শক্তিতে চড়াই ভেঙে ওপরে উঠছে।
এই ব্যাখ্যার পক্ষে চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি পরিমাপের একটি পরীক্ষার কথাও উল্লেখ করা হয়। রাজস্থানের ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির একদল পড়ুয়া ম্যাগনেটোমিটার নামের যন্ত্র দিয়ে ওই এলাকার চৌম্বক ক্ষেত্রের মাত্রা পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে চৌম্বক ক্ষেত্রের মান ছিল ২৫ থেকে ৬০ মাইক্রোটেসলা। তাঁদের দাবি, এই মাত্রার চৌম্বক শক্তি একটি গাড়িকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট নয়। ফলে গাড়ির নিজে থেকে এগিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে চৌম্বক আকর্ষণের ফল বলে মনে করার পক্ষে জোরালো ভিত্তি নেই।
স্বর্গের পথ নিয়ে লোককথা: বিজ্ঞানের ব্যাখ্যার পাশাপাশি ম্যাগনেটিক হিলসকে ঘিরে রয়েছে এক রহস্যময় লোককথাও। স্থানীয়দের মুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একসময় এই পাহাড়ের পথ ধরেই নাকি সরাসরি স্বর্গে পৌঁছনো যেত। যারা সৎ এবং স্বর্গে যাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাদের পাহাড়ের দিকে টেনে নিয়ে যেত অদৃশ্য এক শক্তি। আর যারা সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, তাদের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটত না। লোকবিশ্বাসে, সেই অতিপ্রাকৃত শক্তির ছাপ আজও নাকি রয়ে গিয়েছে পাহাড়ের বুকে।
এই পাহাড়কে ঘিরে আরও একটি দাবি শোনা যায়, চৌম্বকীয় প্রভাবের আশঙ্কায় নাকি পাইলটেরা এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে বিমান চালানো এড়িয়ে চলেন। একান্তই এই পথ ব্যবহার করতে হলে বিমানের উচ্চতা বাড়িয়ে নেওয়া হয় বলেও প্রচলিত রয়েছে। তবে শুধু লোকমুখে প্রচলিত কাহিনির ভিত্তিতে পাহাড়ের চৌম্বক শক্তিকে বাস্তব বলে ধরে নেওয়া যায় না।
রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও লাদাখের এই পাহাড়ি অঞ্চল পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। চারপাশের রুক্ষ পাহাড়, বিস্তৃত উপত্যকা আর অদ্ভুত ভূপ্রকৃতি একে দিয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। গাড়ি সত্যিই চৌম্বক শক্তিতে টান অনুভব করে, নাকি চোখের দৃষ্টিভ্রমে এমন মনে হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পর্যটকেরা পরিচিত হন প্রকৃতির এক বিচিত্র খেলার সঙ্গে। আর সে কারণেই ভারতের এই ‘চৌম্বক পাহাড়’ আজও পৃথিবীর বিস্ময়গুলির তালিকায় কৌতূহল জাগিয়ে রেখেছে।
আলোকিত প্রতিদিন /২৭ অক্টোবর /২০২৬/মওম

