আজ , ।   

হানিমুনে ওমরাহ করতে গিয়ে নবদম্পতির মৃ*ত্যুদণ্ড: দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

আরো খবর

আলোকিত প্রতিবেদক: বিয়ের পর নতুন সংসার। চোখজুড়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। একসঙ্গে পথচলার অঙ্গীকার নিয়ে পৃথিবীর পথে যাত্রা শুরু করেছে দুজন মানুষ। তাদের কাছে হানিমুন মানে শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং একসঙ্গে নতুন জীবনের প্রথম স্মৃতিগুলো তৈরি করা।

ছেলেটি চেয়েছিল, বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে নেপাল কিংবা মালদ্বীপে যাবে। পাহাড় দেখবে, সমুদ্রের নীল জলে চোখ রাখবে, একসঙ্গে কাটাবে জীবনের সুন্দর কিছু মুহূর্ত। কিন্তু মেয়েটির ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। সে স্বামীকে বলেছিল, যে টাকা খরচ করে তারা নেপাল কিংবা মালদ্বীপে যাবে, সেই টাকা দিয়ে বরং ওমরাহ পালন করা যাক। আল্লাহর ঘরে গিয়ে দুজন একসঙ্গে প্রার্থনা করবে। নতুন সংসারের সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি আর ভবিষ্যৎ সন্তানদের জন্য দোয়া করবো।

স্ত্রীর সেই ইচ্ছাতেই হানিমুনের গন্তব্য হলো সৌদি আরবের মক্কা নগরী। তাদের কাছে এই সফর ছিল ভালোবাসার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার আগে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেদের ভবিষ্যৎ সঁপে দেওয়ার এক আন্তরিক চেষ্টা। কিন্তু কে জানত, যে সফরে তারা দোয়া করতে গিয়েছিল, সেই সফরই তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির গল্প হয়ে উঠবে!

মসজিদের বারান্দায় সেই মুহূর্ত: ঘটনাটি মক্কার পবিত্র কাবা ঘরের ভেতরে নয়। নগরীর বাইরে অন্য একটি সাধারণ মসজিদের বারান্দায়। সৌদিতে নারী-পুরুষ একসাথে নামাজ পরা যায়। দুজনেই নামাজ আদায় করেছে। মোনাজাতে হাত তুললে নিজেদের ভবিষ্যৎ সংসারের সুখ-শান্তির জন্য প্রার্থনা করেছে। নতুন জীবনের স্বপ্ন, একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর একসঙ্গে পথ চলার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন। মোনাজাত শেষে সুন্নত নামাজের আগে স্বামী আবেগের বশে স্ত্রীর কপালে একটি চুমু দিল। না, তারা প্রকাশ্যে নগ্ন হয়নি। কোনো যৌনাচারেও লিপ্ত হয়নি। স্বামী তার স্ত্রীর কপালে চুমু দিয়েছিল—যে চুমুকে এই গল্পে নতুন সংসারের প্রতি ভালোবাসা ও মমতার প্রকাশ হিসেবেই দেখা উচিত। এখানে কোনো যৌনতা নেই, কোনো পাপও হওয়ার কথা নয়। কোনো বেগানা নারীকেও চুমু দেয়নি ছেলেটি। দিয়েছে শরিয়া মোতাবেক বিয়ে করা বৈধ স্ত্রীকে।

কিন্তু সেই মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ছিলেন একজন জারজ ও অভিশপ্ত পাকিস্তানি নাগরিক। জারজ ও অভিশপ্ত বললাম– কারণ এই পাকিস্তানীরাই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি মুসলিম হত্যা করেছে। ওই জারজ পাকিস্তানি নিজের মোবাইল ফোনে চুমুর দৃশ্যটি ধারণ করেন। এরপর মসজিদের বারান্দার বাইরে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তাকর্মীদের ডেকে আনেন। নিরাপত্তাকর্মীরা এসে দেখেন, ওই তরুণ-তরুণী সেজদারত অবস্থায় রয়েছেন। পাকিস্তানি নাগরিকটি তাঁদের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও দেখান। এরপর দুজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এক মুহূর্ত আগেও যে দুজন মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, পরমুহূর্তেই তাদের জীবনে নেমে আসে অজানা আতঙ্ক।

চার মাসের বিচার, চার মাসের বিচ্ছিন্নতা গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। কেটে যায় চার মাস। নবদম্পতি একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও তাদের জন্য সীমিত হয়ে যায়।

এই চার মাসে তাদের মনের ভেতর কী চলছিল, তা কল্পনা করাও কঠিন। যে মানুষটিকে পাশে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার কথা ছিল, সেই মানুষটির ভবিষ্যৎ নিয়েই যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তবে প্রতিটি দিন কতটা দীর্ঘ মনে হতে পারে!

এই মামলার সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় ভাষা। পাকিস্তানি সাক্ষী আরবি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশি এই দম্পতি আরবি ভাষা বুঝতে ও বলতে পারতেন না। আদালতে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরা কিংবা সাক্ষীর বক্তব্যের যথাযথ জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাষাগত ব্যবধান তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে ওঠে।

সাক্ষীর বক্তব্য ও ভিডিওকে কেন্দ্র করে মামলার বিচার এগিয়ে যায়। কিন্তু নিজের ভাষায় কথা বলতে না পারা, অভিযোগের আইনি ব্যাখ্যা বুঝতে না পারা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার অসুবিধা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

‘আলহামদুলিল্লাহ’—একই শব্দ, ভিন্ন অনুভূতি: বিচার চলাকালে আদালতে উচ্চারিত একটি শব্দ এই গল্পের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী মুহূর্ত হয়ে ওঠে—‘আলহামদুলিল্লাহ’।

ইসলামে এই শব্দ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা। মানুষ সুখে-দুঃখে, স্বস্তিতে কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতেও এই শব্দ উচ্চারণ করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। কিন্তু একই শব্দ যদি দুই পক্ষ দুইভাবে বোঝে, তাহলে মুহূর্তটি কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে!

এই গল্পে দম্পতি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শুনে মনে করেছিল, হয়তো তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, হয়তো সামনে আবার একসঙ্গে জীবন শুরু করার সুযোগ আসছে। অন্যদিকে, বিচারক আলহামদুলিল্লাহ বলতে বুঝেছিল– অভিযুক্তরা তাদের অপরাধ ও শাস্তি মেনে নিয়েছে।

একটি শব্দের অর্থ বুঝতে না পারা, একটি বক্তব্যের তাৎপর্য ধরতে না পারা—বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়া মানুষের জন্য কত বড় অসহায়ত্ব তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।

ভালোবাসার চুমু, নাকি অপরাধ? সৌদি আরব একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশটির আইন ও বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হয় সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা, মামলার অভিযোগ এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতে।

একইভাবে, প্রকাশ্যে স্বামী-স্ত্রীর স্নেহ প্রকাশের ঘটনাকে কোন আইনের আওতায় বিচার করা হয়েছে, কী প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে এবং কেন সর্বোচ্চ শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর আদালতের নথিতেই পাওয়া সম্ভব।

এই নবদম্পতির গল্প তাই শুধু একটি চুমুর গল্প নয়। এটি ভালোবাসা, ধর্মীয় অনুভূতি, বিদেশের মাটিতে অসহায়ত্ব এবং ভাষা না জানার কারণে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে না পারার মতো গভীর মানবিক প্রশ্নের গল্প।

এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো– যে হজ্ব এজেন্সির মাধ্যমে তারা সৌদি গিয়েছিল সেই এজেন্সির ভূমিকা কি ছিলো? তারা বিষয়টি জানল না কেন?

বাংলাদেশের দূতাবাসের ভূমিকা কি ছিলো? দুইজন নাগরিক গ্রেফতার হলো– ৪ মাস পরে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলো। অথচ আমাদের ছিরুদাস হরিদাস পালেরা সেই খবরই পেলো না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন দিয়ে এইসব ছিরুদাস হরিদাস পাল পুষে লাভ কী?

সৌদি দরলাম জানায়নি। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ খবর ৪ মাসেও বের করতে না পারলে সেখানে আমাদের এজেন্সির লোক পুষে লাভ কী? এগুলারে দেশে ফিরিয়ে এনে জাহাজ ভাঙার কাজ দেয়া দরকার।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত না করার অভিযোগে। এটা কূটনৈতিক শিষ্টাচার আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন। সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে সৌদি আরব একটি আবেগের স্থান। এখানে প্রতিনিয়ত সৌদি নাগরিক দ্বারা যে অসভ্যতা বর্বরতা সংগঠিত হচ্ছে ; তার বিচার কি আমরা দেখি??

ভিয়েনা কনস্যুলার কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক ব্যক্তির তার নিজ দেশের কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করে। সেই অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে। তাই এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশকে প্রশ্ন তোলতে হবে।

বছরের পর বছর সৌদি আরবে বিদেশি নারী গৃহকর্মীদের ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন, বেতন আটকে রাখা এবং রহস্যজনক মৃত্যু ও আত্মহত্যার অভিযোগ উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এসব ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রতিকার ও দায়ীদের বিষয়ে তাদের শরিয়া আইন নীরব কেন???
কোনো সৌদি নাগরিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে, তাঁর বিচার ও শাস্তি কি একই কঠোরতায় নিশ্চিত হয়? আর কোনো মার্কিন নাগরিকের ক্ষেত্রে কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এমন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সাহস কি সৌদি সরকার দেখাতে পারত?

আলোকিত প্রতিদিন/এপি

- Advertisement -
- Advertisement -