নকলা (শেরপুর) প্রতিনিধি: মহালয়ার মাধ্যমে প্রতিটি হিন্দু পল্লীতে শুরু হচ্ছে দুর্গোৎসব। দুর্গোৎসব উপলক্ষে শেরপুরের নকলা উপজেলায় ২০টি মন্ডপে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। প্রতিমাতে তুলির আঁচড় ও মন্ডপ এলাকা সুসজ্জিত করার মাধ্যমে চলছে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। মন্ডপে মন্ডপে প্রতিমাতে রং করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। প্রতিমা অধিকতর আকর্ষণীয় করতে দিনভর পরিশ্রম করছেন তারা। শাস্ত্রীয় মতে এবার বিভিন্ন বার্তা নিয়ে দুর্গাদেবী ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে আগমন করছেন এবং নৌকায় চড়ে গমন করবেন।
নকলা উপজেলাটি ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এবার উপজেলায় ২০টি মন্ডপ ঘিরে দুর্গোৎসব বা পূজা উদযাপন করা হবে। উপজেলার ৪নং গৌড়দ্বার ইউনিয়ন ও ৭নং টালকী ইউনিয়নে পূজা মন্ডপ স্থাপন করা হয়নি। পৌরসভায় ২টি, ১নং ডিজিটাল গনপদ্দী ইউনিয়নে ৪টি, ২নং নকলা ইউনিয়নে ২টি, ৩নং উরফা ইউনিয়নে ৩টি, ৫নং বানেশ্বরদী ইউনিয়নে ১টি, ৬নং পাঠাকাটা ইউনিয়নে ৩টি, ৮নং চরঅষ্টধর ইউনিয়নে ২টি ও ৯নং চন্দ্রকোনা ইউনিয়নে ৩টি মন্ডপের কাজ প্রায় শেষের পথে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নকলা উপজেলা শাখার সদস্য সচিব আশীষ কুমার সাহা জানান, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠী বিহিত পূজা প্রশস্তা। সায়ংকালে শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর বোধন আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর শনিবার শ্রীশ্রী শারদীয় দুর্গাদেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন, সপ্তম্যাদি কল্পরাম্ভ ও মহাসপ্তমী বিহিত পূজা প্রশস্তা। দেবীর ঘোটকে আগমন। ফল- ছত্রভঙ্গন্তরঙ্গমে। ১৮ অক্টোবর রবিবার শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর শুক্লা সপ্তমী বিহিত অধিক পূজা প্রশস্তা (অর্ধরাত ব্যাপি)। ১৯ অক্টোবর সোমবার শ্রীশ্রী শারদীয় দুর্গাদেবীর মহাষ্টম্যাদি কল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমী কল্পারম্ভ ও মহাষ্টমী বিহিত পূজা (সন্ধিপূজা) প্রশস্তা অনুষ্ঠিত হবে। ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর মহানবমী কল্পারম্ভ ও মহানবমী বিহিত পূজা প্রশস্তা এবং দেবীর নবরাত্রিক ব্রত সমাপ্ত হবে। ২১ অক্টোবর বুধবার শ্রীশ্রী শারদীয় দুর্গাদেবীর দশমী বিহিত পূজা ও পূজান্তে দর্পণ বিসর্জন প্রশস্তা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, শাস্ত্রীয় মতে এবার দুর্গা দেবী নৌকায় চড়ে কৈলাশে ফিরে যাবেন। ফল- শস্যবৃদ্ধিস্তথা জলবৃদ্ধি।
উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহবায়ক দেবজিৎ পোদ্দার ঝুমুর আশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিচালি ও মাটি দিয়ে দুর্গা দেবীসহ বিভিন্ন প্রতিমা তৈরি করে তার উপরে মনের মাধুরী মিশিয়ে রং করার কাজ চলছে। প্রতিমা তৈরির কারিগররা পরম যত্নে দেবীদুর্গা, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশসহ বিভিন্ন প্রতিমাতে রং করার কাজ করছেন। এবার কারিগররা প্রতিমাকে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।’ তিনি জানান, পূজা উৎসবকে নির্বিঘ্নে সার্বজনীন উপভোগ্য করে তুলতে উপজেলা প্রশাসন পক্ষ থেকে সব ধর্ম-বর্ণ ও বিভিন্ন পেশা শ্রেণীর লোকজনের সমন্বয়ে প্রস্তুতি সভা করা হয়েছে। এছাড়া মন্দির ও মন্ডপগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
নকলা কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী কালিমাতা মন্দির পূজা মন্ডপের সভাপতি শ্রী উত্তম কুমার বণিক জানান, দুর্গা প্রতিমা তৈরি করার জন্য অন্যান্য বছরের তুলনায় ভালো মানের কারিগর আনা হয়েছে। এতে খরচ বৃদ্ধি হলেও প্রতিমাকে অধিকতর আকর্ষণীয় করার জন্য নতুন নতুন ডিজাইন যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী কালিমাতা মন্দির পূজা মন্ডপের সাধারণ সম্পাদক শ্রী সুরঞ্জিত কুমার বণিক জানান, পূজা উদযাপনের জন্য পূজা মন্ডপ প্রস্তুতি প্রায় শেষ। প্রতিমা তৈরির মধ্য দিয়েই পূজার সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। প্রতিমা তৈরীর কাজ শেষ, এখন প্রতিমাতে রং করা ও মন্ডপ এলাকায় সাজসজ্জার কাজ চলছে। এবার জাঁকজমকভাবে ও নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপিত হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু যুব মহাজোট নকলা উপজেলা শাখার সভাপতি শ্রী নয়ন চন্দ্র শীল বলেন ‘জাঁকজমকভাবে ও নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের কাছে বেশ কিছু দফা উত্থাপন করেছি। এরমধ্যেমন্ডপ এলাকায় সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে মনিটরিং জোরদার করা। স্বেচ্ছাসেব টিম গঠন করে দায়িত্ব বন্টন করে দেওয়া। মন্ডপ এলাকায় কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খরা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট মন্ডপ কমিটির লোকজনকে অবহিত করা। ধর্মীয় শাস্ত্র যথাযথভাবে মেনে চলা এবং সকল প্রকার অশ্লীলতা পরিহার ও মাদক মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
নারী ও শিশু ভক্ত এবং দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা যাতায়াত ও বসার ব্যবস্থা করা। সর্বোচ্চ সতকর্তার সহিত শৃঙ্খলা বজায় রেখে প্রসাদ বিতরণ করা। নিজ নিজ বাসা-বাড়ী জনমানবহীন না রেখে নিজেদের সম্পদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করা। নারী দর্শনার্থীরা যেন বহিরাগতদের দ্বারা কোন প্রকার সমস্যার সম্মূখিন না হন সেদিকে নজর রাখা এবং মন্ডপ এলাকায় কেউ যেন অযথা ভিড় না জমান সেদিকে খেয়াল রাখা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে নারী ভক্ত ও দর্শনার্থীদের অপ্রয়োজনে মন্ডপ এলাকায় ঘুরাঘুরিতে নিরুৎসাহিত করা। অতিরিক্ত শব্দ দূষন থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ এমন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উচ্চ শব্দ পরিহার করা। সর্বোপরি আশেপাশের এলাকায় কোন দরিদ্র সনাতনী পরিবার থেকে থাকলে তাদেরকে উপহার স্বরূপ সহায়তা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতেকরে মিলেমিশে দুর্গাপূজাকে উদযাপন করা সহজ হবে এবং দুর্গোৎসব সাফল্যমণ্ডিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

