মো: আল-আমিন, মানিকগঞ্জ সদর: মানিকগঞ্জ শহরে প্রায়ই দেখা যায় একজন মধ্যবয়সী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী যুবক একটি লাঠি নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে দোকানদারদের সাথে কথা বলছে। প্রথম দেখাতে অনেকে হয়তো ধারণা করতে পারেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে হয়তো দোকানদাররা আর্থিক সহায়তা করছে, আসলে বিষয়টি ভিন্ন । আসল সত্যিটা হচ্ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্যেও শহরে ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করে সংসার চালান মোঃ জসিম (৩৮) নামের এই মধ্য বয়সী ব্যক্তি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত তার বাকপ্রতিবন্ধী স্ত্রী ও ২ জন সন্তানদের ভরণ পোষণ সহ সংসার চালাচ্ছেন তার বাদাম বিক্রির আয় দিয়ে।
বর্তমান সমাজে অনেক প্রতিবন্ধী ও অনেক সুস্থ্য এবং স্বাভাবিক মানুষদের দেখা যায় ভিক্ষাবৃত্তি সহ বিভিন্ন ভাবে মানুষের কাছে হাত পেতে জীবিকা নির্বাহ করে। সেই সময়ে জসিম নিজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার বাকপ্রতিবন্ধী স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে গরম-শীত, রোদ কিংবা বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানিকগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের রোদ উপেক্ষা করে জসিম মানিকগঞ্জ জেলা শহরের কোর্ট চত্ত্বরের পাশের রাস্তায় বসে আছে বাদামের ঝুলি নিয়ে। বাদাম বিক্রি করে জসিম কত বছর যাবত সংসার চালাচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী জসিম দৈনিক আলোকিত প্রতিদিনকে বলেন, “আমি ২৫ বছর ধরে বাদাম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি, আমার বাড়ীওয়ালীও (স্ত্রী) একজন বাক প্রতিবন্ধী। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। আল্লাহ আমার সংসার বাদাম বিক্রির টাকা দিয়েই চালাইতেছে। মানুষের কাছে হাত পাইতা খাওয়ার চাইতে কিছু করে খাওয়া ভালো। আমিও চেষ্টা করি মানুষের কাছে যেন হাত পেতে খেতে না হয়, আমরা স্বামী স্ত্রী জনে প্রতিবন্ধী হলেও আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে মেয়ে ২ জনই সুস্থ আছে ওরা বড় হলে আমার কষ্ট দূর হবে। “
জসিমের সাথে কথা বলে জানা যায়, জসিম প্রতিদিন সকালে তার বাড়ি মানিকগঞ্জ সদরের গড়পাড়া ইউনিয়নের গুসাইনগর থেকে মানিকগঞ্জ শহরের শহীদ রফিক সড়ক দিয়ে নিয়মিত বাদাম বিক্রি করেন। প্রতিদিন অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে তার আর এই অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা সহ সংসারের যাবতীয় ব্যায় নির্বাহ করেন। শহর থেকে জসিমের বাড়ি ৭ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় দুপুরে বাড়ি গিয়ে খাবার খাওয়া সম্ভব হয়না তাই সে নিয়মিত দুপুরে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের একটি হোটেলে ২০ টাকার বিনিময়ে ভাত কিনে খায় । দুপুরে ২০ টাকার বিনিময়ে হোটেলে খাবার খাওয়ার বিষয়ে জসিম বলেন, ” চাইয়া মাগনা খাওয়ার চাইতে কিনা খাওয়া ভালো। তাই বাসস্ট্যান্ডের একটা হোটেল দুপুরে আমারে ভাত খাওয়ায় আমিও প্রতিদিন ২০ টাকা করে দেই ওগো। আমারতো এতো ট্যাকা নাই ঐ কিছু ভাত আর ঝোল টোল দিয়া দেয় আর কি, তাতে আমারো সমস্যা নাই ওমনেই খাই।”
বাদাম বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি জসিম সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতি তিন মাস পর পর প্রতিবন্ধী ভাতা পান বলে জানা যায়। ভাতার টাকার বিষয়ে জসিম বলেন, “প্রতিবন্ধী ভাতা পাই তিন মাস পর পর একসাথে টাকা দেয় কিন্তু ভাতার টাকার পরিমান কম। সরকারই বা আর কি করবো দেশেতো আর আমি একা প্রতিবন্ধী না, মেলা প্রতিবন্ধী আছে। আমার মতো ১ লাখ লোকরে ভাতা দিতে গেলে সরকারের কত ট্যাকা যায় হিসাব করে দেখেনগা। তাই যাই পাই তাও উপকার হয়।”
বাকপ্রতিবন্ধী স্ত্রীর সাথেও রয়েছে জসিমের খুবই ভালো সম্পর্ক। জসিম আরও জানায়, সে নিজে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও তার স্ত্রী কথা বলতে না পারলেও স্ত্রী পাশে থাকলেই জসিম বুঝতে পারে তার স্ত্রী কি বুঝাতে চায়। দুজনই প্রতিবন্ধী হলেও তাদের সংসার জীবনে এ নিয়ে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয়নি। বছর খানেক আগে জসিমের স্ত্রী স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়লে জসিম তার স্ত্রীকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এখন তার স্ত্রী মুটামুটি সুস্থ আছে আর তার স্ত্রী পাশে থেকে কোন ইশারা করলেই জসিম বুঝতে পারে তার স্ত্রী কি বলতে বা বুঝাতে চায়।
সংসার জীবনে জসিমের রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে সিফাত হোসেন পার্শবর্তী একটি স্কুলে ৯ম শ্রেনীতে পড়াশোনার পাশাপাশি ইঞ্জিন মেকানিকের কাজও শিখছে অপর দিকে মেয়ে জান্নাতি আক্তার ৩য় শ্রেনীতে পড়াশোনা করে। শিক্ষার উপরে জসিমের রয়েছে অনেক আগ্রহ। সে নিজে বেশিদূর পড়াশোনা করতে করতে না পারলেও স্বপ্ন দেখেন তার সন্তানরা পড়াশোনা করে একদিন সফলতা অর্জন করবে।
এই যুগে অসংখ্য মানুষের চোখ খুলে দেওয়া জসিমের সম্পর্কে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুশিয়া জামান রত্না বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর জসিমকে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় একটি দোকান তৈরি করে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে দোকানটি বিক্রি করে তিনি একটি গরু ক্রয় করেছেন। তার স্ত্রীকেও প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও সরকারি সুযোগ সুবিধা তাকে দেয়া হয়েছে।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

