আলোকিত ডেস্ক: সাহিত্যে এ বছরের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি ও লেখক অ্যান কারসন। প্রাচীন সাহিত্য-ঐতিহ্যকে সমসাময়িক সাহিত্যে নতুনভাবে উপস্থাপন এবং উদ্ভাবনী ও বৈচিত্র্যময় লেখনীর মাধ্যমে আধুনিক সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল প্রায় ৫টার দিকে সুইডিশ অ্যাকাডেমি এ বছরের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে অ্যান কারসনের নাম ঘোষণা করে। গত বছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন হাঙ্গেরির লেখক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই।
প্রাচীন ও আধুনিকের মেলবন্ধন
১৯৫০ সালে কানাডার টরন্টোতে জন্ম নেওয়া অ্যান কারসন পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে কবিতা লেখা, অনুবাদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮১ সালে ক্লাসিকস বিষয়ে তার ডক্টরাল থিসিস ‘ওদি এত আমো এরগো সাম’ প্রকাশিত হয়।
তার সাহিত্যকর্মে ভাষার প্রতি গভীর মনোযোগ এবং শব্দের নতুন অর্থ আবিষ্কারের প্রবল আকাঙ্ক্ষার সমন্বয় দেখা যায়। কারসনের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো লেখা শুরু করার আগে শব্দের মূল উৎস ও উৎপত্তি খুঁজে দেখা তার সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের বিভিন্ন রচনা অনুবাদ করেও তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন। তার অনুবাদগুলোকে অনেক সময় নিছক অনুবাদ না বলে স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
অনুবাদেও নিজস্বতার ছাপ
কারসনের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক কবি সাফপোর অসমাপ্ত কবিতার অনুবাদ নিয়ে প্রকাশিত ‘ইফ নট, উইন্টার’ (২০০২)। এ ছাড়া গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ (২০০১), ‘অ্যান্টিগন’ (২০১৫) এবং ইউরিপিডিসের ‘বাক্খাই’ (২০১৫)-এর অনুবাদও তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম।
১৯৯০-এর দশকে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালের সংকলন ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’-এর ‘দ্য গ্লাস এসে’ বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দীর্ঘ কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন লেখার ধরন ও শৈলী ব্যবহারের সম্ভাবনাকে এ কাজে তিনি নতুনভাবে তুলে ধরেন।
‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’-এ নতুন আঙ্গিক
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: এ নভেল ইন ভার্স’-কে কারসনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বইটিতে তিনি প্রাচীন গ্রিক কাহিনিকে আধুনিক ভাষা ও মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন।
প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরোসের কবিতার খণ্ডাংশ অবলম্বনে লেখা এ গ্রন্থে জেরিয়ন নামের এক লাল দৈত্যের গল্পকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ করেছেন তিনি।
প্রচলিত ধারার বাইরে কারসনের সাহিত্য
নিজের পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই লেখার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন অ্যান কারসন। ছোট নোট, খসড়া এবং বিচিত্র ধরনের লেখার উপাদানকে তিনি সাহিত্য সৃষ্টির অংশ করেছেন।
এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘ফ্লোট’ (২০১৬)। বইটি ২২টি ছোট পুস্তিকার সমন্বয়ে তৈরি এবং পাঠক চাইলে সেগুলো নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্নভাবে পড়তে পারেন।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’-তেও ভিন্ন ধরনের টেক্সট ও উপস্থাপনার ব্যবহার দেখা যায়। মঞ্চে পরিবেশনের উপযোগী বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যকে চারুকলা ও একাডেমিক গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।
অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী, অপেরা পরিচালক ও থিয়েটার পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেও কারসন তার সৃষ্টিশীলতার পরিধি বাড়িয়েছেন। প্রচলিত সাহিত্যচর্চার বাইরে গিয়ে কাজ করার এই প্রবণতা ১৯৯০-এর দশক থেকে বিশ্বজুড়ে শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করেছে।
৫০ বছর গোপন থাকে মনোনীতদের তালিকা
সাহিত্যে নোবেলের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিজয়ীদের নাম আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। কারণ সুইডিশ অ্যাকাডেমি নোবেলের জন্য মনোনীতদের নাম ৫০ বছর গোপন রাখে।
১৯০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১১৮ বার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ১২২ জন সাহিত্যিক এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন নারী। এছাড়া চারবার সাহিত্যে নোবেল যৌথভাবে একাধিক ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে।

