আজ , ।   

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও: শ্রমিকলীগ নেতা দুলাল সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, টাকা পাচার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড

আরো খবর

অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
সরকারি মালিকানাধীন দেশের অন্যতম শীর্ষ পাঁচ তারকা প্রতিষ্ঠান ‘প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও’ হোটেলটি এখন এক প্রভাবশালী ও অনৈতিক চক্রের জিম্মায় পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের এই হোটেলটি পরিচালনার দায়িত্বে প্যান প্যাসিফিক থাকলেও, বাস্তবে এর সার্বিক শৃঙ্খলা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে হোটেল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা দুলাল চন্দ্র মজুমদারের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই প্রভাববলয়, অনিয়ম, অর্থ পাচার এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে হোটেলটির অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, যা দেশের পর্যটন খাত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুণ্ন করছে।

হোটেলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুলাল চন্দ্র মজুমদার ইউনিয়নের প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগসাজশ কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করে কলকাতার অভিজাত এলাকায় আলিশান বাড়ি বানানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য সামনে এসেছে। স্পর্শকাতর এই সরকারি পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ডা বাস্তবায়ন, নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের সাথে গোপন বৈঠক পরিচালনা এবং নগরীতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অর্থায়নে তাঁর জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও আন্তর্জাতিক চেইন ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও সেখানে বিদেশি পেশাদার কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়ার এক অদৃশ্য ও বিষাক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। পেশাদারদের বহিষ্কার: ব্রিটিশ নাগরিক রবিন জেমস (সাবেক জেনারেল ম্যানেজার), এক্সিকিউটিভ শেফ জহির খান এবং পিপলস অ্যান্ড কালচার বিভাগের ম্যানেজার রুমাসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা অন্যায় চাপ, ভয়ভীতি ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের মুখে পদত্যাগ করতে বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিদেশি পেশাদারদের সরিয়ে সেখানে স্বৈরাচারী শাসনের অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, যার নেপথ্যে মূল কারিগর ছিলেন দুলাল চন্দ্র। সেভিং সেকশনের সাধারণ পদ থেকে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপ প্রয়োগ করে রাতারাতি এক লাফেই তিনটি প্রমোশন বাগিয়ে নিয়ে হাউজ কিপিংয়ের ‘সুপারভাইজার’ হন দুলাল, যা সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।

হোটেলের সাধারণ কর্মচারীদের অধিকার রক্ষা করার কথা থাকলেও, দুলাল সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেহাই পায়নি সেবা বিভাগের নিম্নআয়ের কর্মচারীরাও। আগত অতিথিরা ওয়েটারদের সেবা সন্তুষ্ট হয়ে যে বকশিস বা ‘টিপস’ দেন, তা থেকেও বাধ্যতামূলকভাবে একটি নির্দিষ্ট অংশ কমিশন হিসেবে হাতিয়ে নেয় এই সিন্ডিকেট। বকশিসের অর্থ ইউনিয়ন ফান্ডে জমার নামে ব্যক্তিগত পকেটে পুরছেন দুলাল। অভিযোগ রয়েছে, দুলাল চন্দ্র নিয়মিত রাতের আঁধারে ইউনিয়ন কার্যালয়কে ব্যক্তিগত খাসকামরা হিসেবে ব্যবহার করেন। সেখানে বহিরাগত নারী এনে আমোদ-প্রমোদ এবং প্রতিনিয়ত মদপানের আসর বসানো হয়।

বিগত দিনে হোটেলের শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে সাধারণ কর্মীদের ভোটাধিকার হরণ করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়। দুলাল চন্দ্র মজুমদারকে সভাপতি ও শাহ আলমকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করার পর যারা উক্ত অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন, তাদের অনেককেই চাকরিচ্যুত করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপট বদলালেও সোনারগাঁও হোটেলে এই ফ্যাসিবাদী চক্রের আধিপত্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। চাকরি হারানো ও প্রশাসনিক হয়রানির ভয়ে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে দুলাল চন্দ্র মজুমদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অনিয়মের সার্বিক দায় এড়িয়ে নিজের প্রভাবের কথা স্বীকার করে বলেন, “আমি নির্বাচিত সভাপতি, আমি তো প্রভাব বিস্তার করবই।” ভোটে কারচুপির দাবি অস্বীকার করে তিনি এটিকে ‘স্বচ্ছ নির্বাচন’ বলে আখ্যা দেন। আওয়ামী শ্রমিক লীগের দলীয় পদের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “যে দলের অস্তিত্বই নেই, সেই দলের পদ থাকা না থাকা কোনো বিষয় নয়।” তবে অর্থ পাচার, মদ-নারী কেলেঙ্কারী এবং বকশিস বাণিজ্যের মতো নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকেন।

এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচ তারকা হোটেলের ঐতিহ্য ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকাশিত অভিযোগগুলোর দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

- Advertisement -
- Advertisement -