নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার ধামরাইয়ে শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের (AFBL) অনিয়ম, দখলদারিত্ব ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জনজীবন। বিষাক্ত কেমিক্যাল বর্জ্য ফেলে ধলেশ্বরী ও গাজীখালী নদী ধ্বংস, ১০ একর সরকারি খাস জমি দখল ও গভীর রাতে ক্ষতিকর ধোঁয়া ছড়ানোর পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত শোষণ, শ্রমিক বঞ্চনা, অবকাঠামো বিনাশ এবং মানহীন খাদ্য উৎপাদনের মতো মারাত্মক সব সংকট।
কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার গভীর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ধামরাই ও সাটুরিয়া সীমান্তের বেশ কয়েকটি গ্রামে পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। বাসাবাড়ির সাধারণ টিউবওয়েলে পানি না ওঠায় তীব্র সুপেয় পানির সংকটে ভুগছেন হাজার হাজার পরিবার।
পরিবেশ আইন অমান্য করে পরিচালন ব্যয় বাঁচাতে রাতের আঁধারে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) বন্ধ রেখে বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি গাজীখালী নদীতে ছাড়া হচ্ছে। নদী ও খাল ভরাট করায় সামান্য বৃষ্টিতেই কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি লোকালয়ে জমে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।
পরিবেশ ও স্থানীয় জনপদের পাশাপাশি কারখানার ভেতরেও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কোম্পানি বিপুল পরিমাণ মুনাফা করলেও সাধারণ শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি, চাকরির স্থায়ীকরণ এবং চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা খাটানো হচ্ছে। ন্যায্য দাবি আদায়ে কারখানার ভেতরে ইতিপূর্বে একাধিকবার কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ করেছেন ভুক্তভোগী শ্রমিকরা।
এদিকে বিএসটিআই-এর মানদণ্ড অনুযায়ী জুসে ৮০% থেকে ১০০% এবং ম্যাংগো ড্রিংকসে ন্যূনতম ১০% ফলের পাল্প থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ‘আকিজ ম্যাংগো জুস’-এ নির্ধারিত ১০% পাল্পের ন্যূনতম সীমাও নেই। বোতলের গায়ে “১০০% প্রাকৃতিক” বা “রিয়েল ম্যাংগো” দাবি করে কৃত্রিম ফ্লেভার, সাইট্রিক অ্যাসিড, ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ (সোডিয়াম বেনজোয়েট) ও অতিরিক্ত ফুড কালার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব পানীয় নিয়মিত সেবনে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কিডনি জটিলতা, লিভারের ক্ষতি ও স্থূলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ বিনষ্টের দায়ে জরিমানা:
২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ধামরাইয়ের কারখানা পরিদর্শন করে দেখতে পান, কারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য পাশের গাজীখালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। পরে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শুনানির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে তলব করা হয়। শুনানি শেষে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) আলমগীর হোসেন আকিজ কর্তৃপক্ষকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়, তাতেও ক্ষান্ত হয়নি আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ।

অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রয়ে জরিমানা:
২০২৪ সালের মে মাসে, অনুমোদনহীনভাবে ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘টারবো’ (Turbo) নামক ইলেক্ট্রোলাইট স্পোর্টস ড্রিংকস উৎপাদন ও বাজারজাত করার অপরাধে ঢাকা বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখ শামীম উদ্দিনকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেন। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স ব্যতীত পণ্যটি বিক্রির দায়ে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ফ্রুটিকার বিজ্ঞাপন প্রতারণায় শেখ বশির-জামিলের জরিমানা:
আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লি: ‘ফ্রুটিকা ম্যাঙ্গো জুস’ বাংলাদেশের একমাত্র প্রিজারভেটিভবিহীন জুস দাবি করে বিজ্ঞাপন দেয়। ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর দায়ের হওয়া ১৮৪/১৪ নম্বর এ মামলায় ঢাকার নিরাপদ খাদ্য আদালতে করা নিরাপদ খাদ্য আদেশ ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫)-এর ৬(ক) ধারায় খাদ্যপণ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক শতকরা ৬১ ভাগ সোডিয়াম বেনজোনাইট ও শতকরা ৬৪ ভাগ সালফার ডি অক্সাইড ব্যবহারে, ১৮(১) ধারায় ভুয়া লেবেল ব্যবহার ও ১৯(১) ধারায় গণমাধ্যমে ভুল তথ্যসংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচারের দায়ে শেখ বশিরউদ্দীন ও শেখ জামিলকে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং বিক্রেতা মোহাম্মদ আজিজুল হক সর্দারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন, শ্রম বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নীরবতার মুখে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। অনতিবিলম্বে এসব জনবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা না হলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে কঠোর গণ-আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় কোমল পানীয় স্পিড নিয়ে প্রতিবেদন আসছে…

