আজ , ।   

আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লি: ধামরাই ,পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও কৃষিজমি বিপন্ন করে ভেজাল পণ্য তৈরি করছে

আরো খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক

শীর্ষ করদাতা সম্মানে ভূষিত আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড শিল্পায়নের আড়ালে অনিয়ম, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। ধামরাইয়ে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিষাক্ত বর্জ্য পোড়ানো, নদী ও কৃষিজমি দূষণ, খাস জমি দখল এবং পণ্য ভেজালের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সব জেনেও রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর।

রাতের আঁধারে বর্জ্য পোড়ানো:
ঢাকার ধামরাইয়ে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লি:-এর কারখানায় দিনরাত চলছে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যের তাণ্ডব। স্থানীয়দের অভিযোগ ও ‘দৈনিক আলোকিত প্রতিদিন’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র। দিনশেষে রাত গভীর হলেই কারখানার ভেতরে শুরু হয় বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য পোড়ানোর উৎসব। রাতভর পোড়ানো বর্জ্যের বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের বাতাস। কারখানা সংলগ্ন এলাকার শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক চর্মরোগ, এলার্জি ও চোখ জ্বালাসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে অভিযোগ করেছে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার ফলে ঘরে ব্যবহৃত টিন দ্রুতই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

হুমকির মুখে গাজীখালী নদী ও কৃষি: কারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি পার্শ্ববর্তী গাজীখালী নদী ও খাল-বিলে ফেলার কারণে ধ্বংস হচ্ছে মৎস্যসম্পদ। রাসায়নিক ছড়ানোয় উর্বরতা হারিয়ে অনাবাদি হয়ে পড়ছে আশপাশের কৃষিজমি। মিলের বিষাক্ত রাসায়নিক পানি ফেলা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ধলেশ্বরী নদীতে। বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত মরে ভাসছে নদীর মাছ ও জলজ প্রাণী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, আকিজ ফুড সরকারকে সর্বোচ্চ ভ্যাট দেয়, সরকার কেন তাদের ভ্যাট নিয়ে তাদের ক্ষতি করবে, ক্ষতি তো হচ্ছে আমাদের মত সাধারণ মানুষের। কিন্তু আমরাও তো সরকারকে ভ্যাট দিই। সরকারের উচিৎ আমাদের জনস্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া। এই এলাকার অনেক মানুষ এখন রোগ আক্রান্ত, বাড়িতে পরিবার নিয়ে ঘুমাতে পারি না দুর্গন্ধে। বয়স্করা অসুস্থ হলে তাদের বাড়িতে রাখা যায় না, গন্ধে আরো অসুস্থ হয়ে যায়।

বয়স্ক এক ব্যক্তি আবুল হোসেন (ছদ্মনাম) এক ব্যাক্তি জানায়, “আমরা আগে এই নদীতে মাছ ধরছি, আর এহন মাছ তো দূরের কথা ব্যাঙও পাওয়া যায় না। সব শ্যাষ কইরা দিছে আকিজ। সরকার তো এগুলা দেহে না, এগো কাছ থেইক্যা ট্যকা নিলে দেখবো কেমনে। কত সাংবাদিক আহে সবাই ট্যাকা খাইয়া মুখ বন্ধ কইরা রাখে। গেটে গেলে আপনাগোরও বান্ডিল দিব, আপনারাও থাইমা যাইবেন। আমগো লাইগ্যা কেউ কিছু করে না। সবাই ট্যকার লাইগা আহে”।

এ ব্যাপারে এক পরিবেশ কর্মী বলেন, “আকিজ দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যদি এখনই থামানো না যায় এরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এসময় তিনি আরো বলেন, তাদের ইটিপি প্ল্যান্ট আছে কিন্তু তারা তা ব্যবহার করোনা। কারণ ইটিপি ব্যবহার ব্যয় সাপেক্ষে। তারা পরিবেশ ছাড়পত্রের কোন নিয়মই ঠিকমতো মানছে না। তারা যদি এগুলো বন্ধ না করে তাহলে আমরা বড় আকারে মানববন্ধন করবো”।

সরকারি জমি দখল ও পণ্যে মারাত্মক ভেজাল
পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে আকিজের বিরুদ্ধে:
১. ভূমি আত্মসাৎ: ধামরাই, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের বিরুদ্ধে এগ্রো ফার্ম ও শিল্প বিস্তারের নামে প্রায় ১০ একর সরকারি খাস জমি, খালের অংশ এবং জনসাধারণের জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ রয়েছে।

২. মানহীন ও ভেজাল জুস: বিএসটিআই-এর মানদণ্ড (BDS) অনুযায়ী ম্যাংগো ড্রিংসে ন্যূনতম ১০% এবং সাধারণ জুসে ৮০%-১০০% ফলের পাল্প থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর ল্যাব পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘আকিজ ম্যাংগো জুস’-এ নির্ধারিত মানের ধারেকাছেও ফলের পাল্প নেই। অর্থাৎ ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা করে বাজারে নিম্নমানের জুস বিক্রি করছে তারা।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) পানীয়জাত পণ্যের নির্দিষ্ট মানদণ্ড উপাদান নির্ধারণ অনুযায়ী, বোতলের গায়ে তাজা আমের ছবি এবং “১০০% প্রাকৃতিক” বা “রিয়েল ম্যাংগো” দাবি করে রাসায়নিক মিশ্রণ বিক্রি করা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কৃত্রিম ফ্লেভার ও অতিরিক্ত কেমিক্যালযুক্ত এসব পানীয় নিয়মিত সেবনে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কিডনি জটিলতা, লিভারের ক্ষতি, গ্যাস্ট্রিক ও স্থূলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

ফ্রুট জুস (Fruit Juice): এতে ন্যূনতম ৮০% থেকে ১০০% পর্যন্ত প্রাকৃতিক ফলের পাল্প বা রস থাকা বাধ্যতামূলক। গো ড্রিংকস (Mango Drinks): এতে কমপক্ষে ১০% প্রাকৃতিক ফলের পাল্প থাকতে হবে। ফ্লেভার্ড পানীয়: যেগুলোতে ফলের পাল্পের পরিমাণ ১০%-এর কম থাকে, সেগুলোকে কোনোভাবেই ‘জুস’ বা ‘ড্রিংকস’ হিসেবে বাজারজাত করা যায় না; এগুলো কেবল আর্টিফিশিয়াল ফ্লেভার্ড পানীয়।

বুয়েট ল্যাব পরীক্ষা ও প্রাপ্ত ফলাফল
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক জুসের রাসায়নিক ও উপাদানগত বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষার প্রধান দিকগুলো হলো: পাল্পের অনুপস্থিতি: ‘আকিজ ম্যাংগো জুস’সহ বেশ কিছু ব্র্যান্ডের পণ্যে বিএসটিআই নির্ধারিত ১০% পাল্পের ন্যূনতম সীমাও পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফলের রসের বদলে কৃত্রিম ফ্লেভার, সাইট্রিক অ্যাসিড এবং সিরাপ ব্যবহার করা হয়েছে। সংরক্ষণাগার ও রঙ (Additives & Colors): নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কৃত্রিম রঙ (Food Color) এবং সোডিয়াম বেনজোয়েটের মতো প্রিজারভেটিভের উপস্থিতি দেখা গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।

ধামরাইয়ের ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের দাবি,  প্রভাবশালী গ্রুপ হওয়ায় আকিজের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। প্রতিবাদ করতে গেলেই নেমে আসে ভয়ভীতি ও হুমকি। আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের চেয়ারম্যানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার স্টাফ কল রিসিভ করেন। নদী-পরিবেশ দূষণ, সরকারি জমি দখল ও করফাঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে মারাত্মক উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফোন কেটে দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি:
আকিজের এই অব্যাহত অনিয়ম ও পরিবেশগত নৈরাজ্য বন্ধে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ধামরাইয়ের এলাকাবাসী। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে প্রেরিত লিখিত আবেদনে এলাকাবাসী ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন:

১। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে আকিজ গ্রুপের অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত।

২। পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভূমি আইন লঙ্ঘনে দায়ীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার।

৩। বর্জ্য পোড়ানো অবিলম্বে বন্ধ করে গাজীখালী নদী ও আশপাশের পরিবেশ পুনর্বাসন।

৩। দখলকৃত ১০ একর সরকারি খাস জমি ও খাল উদ্ধার।

৪। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও অসুস্থ সাধারণ জনগণকে উপযুক্ত চিকিৎসা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

৫। প্রতি ছয় মাসে পরিবেশগত অডিট (Environmental Audit) নিশ্চিত করা।

প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকলে অচিরেই ধামরাই ও মানিকগঞ্জজুড়ে বিশাল গণ-আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভুক্তভোগী জনতা ও সচেতন মহল।

- Advertisement -
- Advertisement -