আজ , ।   

সোনারগাঁও হোটেলের শ্রমিকলীগ নেতা দুলালের, টাকা পাচার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বকশিস বানিজ্যে, দেশি-বিদেশীদের মধ্যে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে

আরো খবর

স্টাফ রিপোর্টার:

সরকারি মালিকানাধীন দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পাঁচ তারকা হোটেল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও এখন নানা অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আলোচিত। হোটেলটির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুলাল চন্দ্র মজুমদারগংদের বিরুদ্ধে হোটেলের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।

হোটেলের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা দুলাল চন্দ্র এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ফলে হোটেলের স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাদের দাবি, ভিন্নমত পোষণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয় বকশিস বানিজ্যের জন্য। অনেককে চাকরি হতে অব্যাহতি দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নীরব রাখা হচ্ছে। অনেককে আবার বকশিস নিয়ে তা শ্রমিক ইউনিয়নের ফান্ডে জমার নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত দুলাল চন্দ্র।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই প্রভাববলয়ের কারণে হোটেলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন বা দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক জেনারেল ম্যানেজার ব্রিটিশ নাগরিক রবিন জেমস, এক্সিকিউটিভ শেফ জহির খান এবং পিপলস অ্যান্ড কালচার বিভাগের ম্যানেজার রুমাসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। দুলাল চন্দ্র উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের টাকা, মদ, নারী সাপ্লাই দিয়ে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিদেশি জিএমদের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ:
প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো ও পরিচিত পাঁচ তারকা হোটেল। হোটেলটির মালিক বাংলাদেশ সরকার হলেও আন্তর্জাতিক হোটেল ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান প্যান প্যাসিফিকের ব্যবস্থাপনায় এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু হোটেলের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বিদেশি নাগরিকদের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অদৃশ্য বাধা কাজ করছে। তাদের দাবি, বিদেশি কোনো কর্মকর্তা জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি প্রভাবশালী মহল তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ চাপ, প্রশাসনিক জটিলতা ও বিরোধ তৈরি করে তাকে দায়িত্ব থেকে সরানোর পরিবেশ তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ব্রিটিশ নাগরিক রবিন জেমসের দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনাটিও এ প্রেক্ষাপটে তদন্তের দাবি রাখে। রবিন জেমসের চাকরি ছাড়ার পর হোটেলের সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগের ক্ষমতা খাটিয়ে এমডি পদে বসান। তৎকালীন আওয়ামীলীগের অধিকাংশ মন্ত্রী, এমপিদের সাথে ছবি তুলে তদবির বাজ্য চালিয়ে যাওয়া অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাতারাতি খোলস পাল্টে ফেলার চেষ্টা করছেন। অনকলে কর্মরত স্টাফদের চাকুরী স্থায়ী কারণের মূলহোতা হচ্ছে সোনারগাঁও হোটেল কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল চন্দ্র। সব জায়গায় পরিবর্তন হলেও হোটেল সোনারগাঁও এ কোন পরিবর্তন নেই। অধিকাংশ ফ্যাসিস্টদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হোটেল সোনারগাঁও। অধিকাংশ দূর্নীতি, তদবির বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলেন, শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল চন্দ্র মজুমদার। হোটেল সূত্রগুলোর দাবি, দুলাল চন্দ্র মজুমদারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা হিসেবে নিজস্ব প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে । শ্রমিক ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী নেতা এবং হোটেলের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার মধ্যে যদি কোনো ধরনের অস্বচ্ছ সমন্বয় তৈরি হয়, তাহলে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষা করবে কে?

তাদের অভিযোগ, এই দুই প্রভাবের সমন্বয়ে হোটেলের অভ্যন্তরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। একাধিক কর্মীর দাবি, কেউ প্রভাবশালী মহলের সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করলে তাকে বিভিন্নভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও দেখানো হয় বলে অভিযোগ।

ইউনিয়ন অফিসে রাতযাপন ও মদপান ও নারীকেলেন্কারীর অভিযোগ:
দুলাল চন্দ্র মজুমদারের বিরুদ্ধে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হোটেলের কয়েকজন কর্মীর দাবি, তিনি নিয়মিত শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যালয়ে রাতযাপন করেন। ওই কার্যালয়ে মদপানসহ নারীদের নিয়ে আমোদ ফুর্তির ঘটনাও ঘটে। এছাড়া মাঝেমধ্যে বহিরাগত নারী সেখানে নিয়ে আসা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

ওয়েটারদের বকশিস থেকেও ‘কমিশন’ নেওয়ার অভিযোগ:
হোটেলের ওয়েটার ও সেবা বিভাগের কয়েকজন কর্মীর অভিযোগ আরও বিস্ময়কর। তাদের দাবি, হোটেলে খাবার গ্রহণ শেষে অতিথিরা ওয়েটারদের যে বকশিস বা টিপস দেন, তার একটি অংশ থেকেও কথিতভাবে কমিশন দিতে হয়। বকশিস কর্মীদের ব্যক্তিগত পরিশ্রম ও সেবার স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া অর্থ হলেও এর একটি অংশ নির্দিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দিতে হয়, এমন চাপের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় হোটেলের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিবেশ এবং কর্মীদের ন্যায্য প্রাপ্য অর্থের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভয় ও নীরবতার পরিবেশের অভিযোগ:
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বর্তমানে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ বিরাজ করছে। তাদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বললে চাকরি, পদোন্নতি বা কর্মস্থলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে হয়। ফলে অনেকেই অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হন না। একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, “এখানে অনেকেই কথা বলতে চান, কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় কাজ করে। কার বিরুদ্ধে কথা বলছি, সেটাও সবাই জানে।”

ইউনিয়ন নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন:
হোটেলের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের বিগত নির্বাচন নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাধারণ কর্মচারীদের ভোটে প্রার্থী নির্বাচনের পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামীগের হস্তক্ষেপে দুলাল চন্দ্র মজুমদারকে সভাপতি এবং শাহ আলমকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং বিরোধিতা করায় কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পরবর্তীতে চাকরি হারিয়েছেন। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “দুলাল চন্দ্র মজুমদার অবৈধ পন্হায় টাকা কামিয়ে ভারতের কলকাতায় বাড়ি কিনেছেন, যেকোনো সময়ে পারি জমাতে পারেন টাকা পাচার কারী দুলাল চন্দ্র মজুমদার। ”

অভিযোগের বিষয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“আমি নির্বাচিত সভাপতি। আমি তো প্রভাব বিস্তার করবই।” ভোট কারচুপির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এখানে অন্যান্য জায়গার তুলনায় অনেক স্বচ্ছ ভোট হয়।” জাতীয় শ্রমিক লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটিতে কার্যনির্বাহী পরিষদের শিক্ষা, সাহিত্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক পদে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “দেশে যে দলের অস্তিত্বই নাই, সেই দলের কমিটি কী করে থাকে? সুতরাং ওই পদে থাকা না থাকা কোনো বিষয় না। শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাবশালী অংশের সঙ্গে যোগসাজশ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্ব এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ তৈরি, ইউনিয়ন অফিসে রাতযাপন, সেখানে মদপানের অভিযোগ, বহিরাগত নারী নিয়ে আসা এবং ওয়েটারদের বকশিস থেকে কথিত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে পরপর দুই দিন একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও শুধু একটি বাণিজ্যিক হোটেল নয়; এটি সরকারের মালিকানাধীন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি বারবার প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদেশি ব্যবস্থাপকদের দায়িত্ব পালনে বাধা, একের পর এক কর্মকর্তা চাকরি হারানো, শ্রমিক ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তার, কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক, ইউনিয়ন অফিস ব্যাক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ এবং ওয়েটারদের বকশিস থেকে কথিত কমিশন নেওয়ার মতো অভিযোগসহ টাকা পাচার করে ভারতে বাড়ি ক্রয়ের বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশ্ন এখন একটাই সোনারগাঁও কার নিয়ন্ত্রণে?
সরকারি মালিকানাধীন দেশের ঐতিহ্যবাহী পাঁচ তারকা হোটেলটি কি পেশাদার ব্যবস্থাপনার নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি অভ্যন্তরীণ কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এ বিষয়ে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন। কর্মকর্তারা বলেন, সংবাদটি প্রকাশের পর অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আলোকিত প্রতিদিন/ এম এ টি

- Advertisement -
- Advertisement -