আজ , ।   

নফস নিয়ন্ত্রণে রাখার ১০ কার্যকর উপায়

আরো খবর

প্রবৃত্তির কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও

আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ

আলোকিত প্রতিবেদক :

নফস মানুষের সত্তার স্বাভাবিক একটি অংশ। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির মধ্যেই এর অবস্থান। নফস মানুষকে ভালো ও মন্দ—উভয় পথেই পরিচালিত করতে পারে। তবে মানুষের ভেতরের বিভিন্ন প্রবৃত্তি ও নিচু আকাঙ্ক্ষা তাকে বারবার অন্যায় ও গুনাহের দিকে টেনে নিতে পারে। তাই নফসের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং এর কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব।

ইসলামি শিক্ষায় আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমন একটি অন্তর গড়ে তোলাই লক্ষ্য, যা আল্লাহর প্রতি অনুগত এবং তাঁর নির্দেশ পালনে সদা প্রস্তুত।

মানুষের স্বাভাবিক ও পরিশুদ্ধ সত্তা তাকে সত্যবাদিতা, মানুষের সহযোগিতা, মা-বাবার প্রতি সদাচরণ, মানবকল্যাণ এবং একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করে। অন্যদিকে প্রবৃত্তির অবক্ষয় মানুষকে প্রতারণা, অহংকার, অনৈতিকতা, অনর্থক কথাবার্তা, অশ্লীলতা এবং ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

যখন নফসে আম্মারা—অর্থাৎ মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিতকারী প্রবৃত্তি—মানুষের বিবেক ও প্রশান্ত আত্মাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন সে ধীরে ধীরে অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যায়। আল্লাহর কাছ থেকেও দূরে সরে পড়ে। বিপরীতে প্রশান্ত আত্মা মানুষকে ইবাদত, আনুগত্য ও সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—

১. নিয়মিত আত্মশুদ্ধির চেষ্টা
আত্মশুদ্ধির জন্য ইবাদত বাড়াতে হবে এবং আল্লাহর আনুগত্যের চেষ্টা করতে হবে। কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ ফরজ ইবাদতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা উচিত।

২. সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করা
মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত তার জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এসব সিদ্ধান্ত দুনিয়ার জীবন ও পরকাল—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই প্রতিদিনের জীবনে আল্লাহকে স্মরণে রাখা এবং নেতিবাচক আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা জরুরি।

৩. গুনাহ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকা
মন্দ চিন্তা, কথা বা কাজ হয়ে গেলে দ্রুত তা থেকে ফিরে এসে ভালো কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে দ্বীনি ও উপকারী জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

জ্ঞান মানুষকে সত্য-মিথ্যা এবং বৈধ-অবৈধের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। ফলে ভুল কাজ থেকে নিজেকে সংযত রাখাও সহজ হয়।

৪. দুনিয়ার জীবন যে ক্ষণস্থায়ী, তা মনে রাখা
দুনিয়ার জীবন সাময়িক। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী পরকালই মানুষের চূড়ান্ত আবাস। তাই দুনিয়ার মোহে অতিরিক্ত ডুবে না গিয়ে পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

জীবনকে একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করলে নফসের বিভিন্ন প্রলোভন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।

৫. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন মুসলমানদের জন্য উত্তম আদর্শ। তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ অনুসরণ করা সম্ভব।

তাই তাঁর জীবনাদর্শ সম্পর্কে জানা এবং সাধ্য অনুযায়ী তা নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত।

৬. কাজের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করা
কোনো কাজ করার আগে তার ভালো-মন্দ প্রভাব নিয়ে ভাবা উচিত। একটি কাজ তাৎক্ষণিকভাবে আনন্দদায়ক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নামাজের মতো ইবাদত মানুষকে আল্লাহর স্মরণে রাখার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে। বিপরীতে অলসতা বা অবহেলার কারণে ইবাদত ছেড়ে দিলে অপরাধবোধ, অনুশোচনা ও নানা অজুহাতের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

৭. সময়ের সঠিক ব্যবহার করা
নিজের সময় কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। সময়কে অর্থবহ কাজে ব্যস্ত রাখলে নফসের অপ্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তির পেছনে ছুটে চলার সুযোগ কমে।

সৎকর্ম, জ্ঞানার্জন, মানুষের উপকার এবং উম্মাহর কল্যাণে নিজেকে যুক্ত করা যেতে পারে। এসব কাজকে পরকালের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

৮. সৎ ও ভালো মানুষের সঙ্গ নেওয়া
মানুষের চরিত্র ও চিন্তাভাবনায় তার পরিবেশ এবং সঙ্গীদের প্রভাব থাকে। তাই কার সঙ্গে নিয়মিত ওঠাবসা করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

এমন মানুষের সঙ্গ বেছে নেওয়া উচিত, যারা ঈমান ও দ্বীন পালনে উৎসাহিত করেন এবং ভালো কাজে সহযোগিতা করেন।

৯. নিয়ত শুদ্ধ রাখা
প্রতিটি ভালো কাজের আগে নিজের নিয়ত পর্যালোচনা করা উচিত। কাজটি কেন করা হচ্ছে—তা নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার।

মুমিনের সব কাজের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই আমলকে লোকদেখানো বা পার্থিব প্রশংসার পরিবর্তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করার চেষ্টা করতে হবে।

১০. আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা
নফসকে নিয়ন্ত্রণ ও অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। সুস্থ ও পবিত্র অন্তরের জন্য নিয়মিত প্রার্থনা করা উচিত।

এমন অন্তর কামনা করতে হবে, যেখানে আল্লাহর ভালোবাসা রয়েছে এবং যে অন্তর আরও বেশি আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় থাকে।

নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা একদিনের কোনো বিষয় নয়; এটি ধারাবাহিক আত্মশুদ্ধির একটি প্রক্রিয়া। নিয়মিত ইবাদত, আত্মসমালোচনা, সৎ মানুষের সঙ্গ, ভালো কাজে ব্যস্ত থাকা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার মাধ্যমে এই পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

- Advertisement -
- Advertisement -