নিজস্ব প্রতিবেদক:
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া জনআকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় জাতীয় ঐক্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে মঞ্চ ২৪ আয়োজিত ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অনৈক্য ও বাংলাদেশের ক্ষতি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে নেমে এসেছিলেন। বিচারক, সচিব, পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার, রিকশাশ্রমিক ও শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণির মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, হেলিকপ্টার ও এপিসি থেকে গুলি ছোড়ার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এর মধ্য দিয়ে দেশে একটি অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল। জাতীয় ঐক্যের জায়গায় কোনো অনৈক্য থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে মূল বিভাজন তৈরি হচ্ছে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন নিয়ে। মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা পরিচালিত হবে না। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিপীড়ন, হত্যাকাণ্ড এবং মিথ্যা মামলা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হবে না। নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করা হবে না এবং দুর্নীতি থেকে রাষ্ট্র বেরিয়ে এসে সুশাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার এবং বিরোধী দল- দুই পক্ষই এটি বাস্তবায়নে একমত হয়ে স্বাক্ষর করেছে। এখন বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে জনগণ কোন পদ্ধতিতে তা বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা জুলাই চার্টারের গণভোটের রায় বাস্তবায়িত দেখতে চায়।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন না সংস্কারের মাধ্যমে পরিবর্তন করা হলো, সেটি জনগণের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। জনগণ দেখতে চায়, সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে জনগণের বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলছেন, সংসদ কার্যকরভাবে কাজ করছে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এসেছে। এসব প্রত্যাশা পূরণ না হলে জাতীয় ঐক্যে বিভাজন আরও বাড়বে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বা অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের ধারণা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এর অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু এসব বিচার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সামান্য কিছু রায় হয়েছে। তাই দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা দরকার।
গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাবলি রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে কারা, কীভাবে এবং কোন বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল, তা নথিবদ্ধ করতে হবে।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পরও কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে মন্তব্য করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, যারা ট্যাংক, এপিসি ও হেলিকপ্টারের সামনে দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন, তারা যখন দেখবেন তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংস্কার হচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সেই ক্ষোভ বাড়তে থাকলে রাষ্ট্রে আবারও আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সরকার অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, সরকার দ্রুত কোনো কাজ করতে পারছে না এবং সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান বা মোকাবিলা করতে পারছে না। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। সংসদে যারা গেছেন, তারা জুলাইয়ের মতো একটি মহাবিপ্লব কোন প্রেক্ষাপটে এবং কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি।
বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক বিরোধিতা করা এবং বিকল্প পথ দেখানোর দায়িত্ব বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। ফলে জুলাইয়ের পর গঠিত সংসদে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়েই বাংলাদেশের গণআকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রায় দুই হাজার মানুষ জুলাইয়ে রক্ত দিয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে ১৭ বছরে অসংখ্য মানুষের গুম, নিখোঁজ হওয়া, মামলা ও কারাবরণের দীর্ঘ ইতিহাস। এই ত্যাগ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস মাথায় রেখে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। অথবা তাদের জন্যও খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
জুলাইয়ের শহীদ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কথা স্মরণ করিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, সন্তান হারানো পরিবারের বেদনা এবং গুম হয়ে যাওয়া স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারের কষ্ট ভুলে গেলে পথ হারাতে হবে। তাই জুলাইয়ের শহীদদের স্বপ্ন এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা ভুলে যাওয়া যাবে না।
মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন- সংগঠনটির উপদেষ্টা ডিউক হুদা, ড. ফয়জুল হক, লে. কর্নেল ফেরদৌস আজিজ ও শেখ মহিউদ্দিন; সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম; সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা।
আলোকিত প্রতিদিন /০৪ সেপ্টেম্বর/২০২৬/মওম

