আজ , ।   

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ বছরের তেল চুক্তি, ক্ষু*ব্ধ বিরোধীরা

আরো খবর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির ১০০ বছরের একটি চুক্তি ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এ চুক্তিকে ‘ঔপনিবেশিকতার দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং দেশটির বামপন্থিদের একটি অংশও চুক্তিটিকে জাতীয় সম্পদ হস্তান্তরের সঙ্গে তুলনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। গত জানুয়ারিতে কারাকাসে মার্কিন এলিট বাহিনীর অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবে এবং দেশটির তেল বিক্রির বিষয়টিও দেখভাল করবে।

বুধবার কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে নতুন এই তেল চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সেই পরিকল্পনাই বাস্তব রূপ পেল বলে জানিয়েছে বিবিসি। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানি ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য একচেটিয়া অধিকার পেয়েছে। এসব তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে, যা ভেনেজুয়েলার মোট প্রমাণিত তেল মজুদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।

চুক্তির বিশাল পরিসর নিয়ে দুই দেশের সরকারের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন নয়। উভয় পক্ষই এটিকে নিজেদের জন্য লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। ট্রাম্প চুক্তিটিকে বিশ্বের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এটিকে ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসবে এবং দেশটি ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর ও রাজস্ব আয় করতে পারবে।

তবে চুক্তির শর্ত নিয়ে সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তারাও। ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক ইরান ও ভেনেজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ দূত এলিয়ট আব্রামস চুক্তিটিকে ‘ভয়ানক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, রদ্রিগেজ কোনো কারণ ছাড়াই জাতীয় সম্পদের প্রায় ২০ শতাংশ দিয়ে দিয়েছেন। তার অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব মূলত ওয়াশিংটনের নির্দেশই অনুসরণ করছে। চুক্তির শর্তকে এতটাই একপেশে বলে মনে করেন আব্রামস যে তার ভাষায়, এটি অনেকটা ‘ঔপনিবেশিকতার দুঃস্বপ্নের’ মতো।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস প্রকাশিত একটি ফ্যাক্ট শিটে চুক্তির কিছু কাঠামোগত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলায় শেভরনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনারস—ন্যাবেপের সঙ্গে কাজ করবে মার্কিন সরকার। চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো, ন্যাবেপের পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে। সমালোচকদের মতে, এই শর্তগুলো ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করার পথ তৈরি করছে।

এদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ার বাইরে ভেনেজুয়েলার মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশের উৎপাদন বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বারগাম ফক্স বিজনেসকে বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ‘ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্র’ পশ্চিম এশিয়া থেকে আবার পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরে আসছে।

হোয়াইট হাউসের ভাষ্য, চুক্তিটি অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘মনরো ডকট্রিন’-এর পুনঃপ্রতিষ্ঠারও ইঙ্গিত দেয়। এই নীতির মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিম গোলার্ধে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়, মার্কিন প্রভাব ও আধিপত্য নিশ্চিত করা। ট্রাম্প আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই এই চুক্তি থেকে লাভ পাওয়ার কথা বললেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি।

তাদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত সংকটে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উৎপাদন বাড়াতে অনেক বছর সময় লাগবে। হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লুইস পাচেকোর মতে, প্রায় ৩০ বছর আগের উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে ভেনেজুয়েলাকে আগামী আট বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অতীতের অব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল সম্ভাবনাকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেই ব্যবস্থার হাতেই এত বিপুল অর্থের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে। চুক্তিতে সবচেয়ে বেশি হতাশা প্রকাশ করেছে ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। মাদুরো সরকারের সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এত দ্রুত ঘনিষ্ঠতা নিয়েও তারা ক্ষুব্ধ। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিয়া কোরিনা মাচাদো সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা না করলেও বিরোধী শিবিরের অনেকেই প্রকাশ্যে নিজেদের ক্ষোভ জানিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো হাউসম্যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ভেনেজুয়েলার জনগণকে মুক্ত করার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিপীড়কদের সঙ্গে মিত্রতা বেছে নিয়েছে। তার অভিযোগ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে ওয়াশিংটন একটি ‘অবৈধ ও নিপীড়ক সরকারের’ সঙ্গে সম্পদ দখলের অসাংবিধানিক পথ বেছে নিয়েছে। চুক্তি নিয়ে শুধু বিরোধীরাই নয়, ভেনেজুয়েলার বামপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের একটি অংশও ক্ষুব্ধ।

ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসইউভি ডেলসি রদ্রিগেজকে সমর্থন করলেও কট্টর সমাজতন্ত্রীদের অনেকে এই চুক্তিকে ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন। প্রায় তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ভেনেজুয়েলার বামপন্থিদের কাছে বর্তমান চুক্তিটি বিশেষভাবে অস্বস্তিকর। তাদের অভিযোগ, দেশের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদই এখন পুরনো প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজের আমলের তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেস বলেছেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ঔপনিবেশিকতার’ দরজা খুলে দিচ্ছে। বর্তমান চুক্তির সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজের আমলের নীতির পার্থক্যও স্পষ্ট।২০০৮ সালের শুরুতে চাভেজ তার সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘আলো প্রেসিদেন্তে’ অরিনোকো নদীর অববাহিকায় সাবেক এক্সনমোবিল তেলক্ষেত্র থেকে সম্প্রচার করেছিলেন।

এর আগে ওই অঞ্চলে এক্সনমোবিলের কিছু সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়েছিল। সে সময় চাভেজ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ‘লাগাম’ এখন তাদের নিজেদের হাতে এবং তা আর কখনো ছেড়ে দেওয়া হবে না। ওয়াশিংটনপন্থি আগের সরকারগুলো ভেনেজুয়েলাকে ‘গ্রিংগোদের জাতিতে’ পরিণত করেছিল বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু চাভেজের উত্তরসূরিদের আমলেই এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হলো শতবর্ষব্যাপী এই বিশাল তেল চুক্তি। ফলে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয়ই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

- Advertisement -
- Advertisement -