নিজস্ব প্রতিবেদক
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নাজমুল হোসেনের বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাকে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ‘বিশেষ এজেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে তার কথিত কর্মকাণ্ডের তদন্ত, গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন মহলের লোকজন।
অভিযোগ রয়েছে, নাজমুল হোসেন নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে ‘মায়ের কান্না’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচিতে অংশ নেন। এসব অনুষ্ঠানে তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য প্রচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া রংপুরে আয়োজিত ‘বিপন্ন মানবতা: জিয়াউর রহমানের গুমের ইতিহাস’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় জিয়া পরিবারকে নিয়ে বিষোদ্গার এবং রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় তিনি জিয়া পরিবারকে জনমনে বিতর্কিত করার পাশাপাশি তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন ঠেকাতেও বিভিন্ন অপচেষ্টা চালিয়েছেন।
নাজমুল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরও তিনি আত্মগোপনে থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদস্থ দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে কৌশলে প্রবেশাধিকার লাভ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে তিনি বিভিন্ন স্পর্শকাতর নথি ও সরকারি তথ্য সংগ্রহ করে দেশের বাইরে অবস্থানরত সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছে পাচার করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা এবং কথিত তথ্য পাচারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
নাজমুল হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বইয়ের মেধাস্বত্ব ও গ্রন্থস্বত্ব নিয়ে জালিয়াতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু বুক কর্নার’ প্রকল্পের আওতায় ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ নামের একটি বইয়ের ৬৫ হাজার ৭০০ কপি কেনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বইটির প্রকৃত সম্পাদক ছিলেন অমিতাভ দেউরী। কিন্তু পরবর্তীতে মূল সম্পাদকের নাম বাদ দিয়ে নাজমুল হোসেন নিজের নাম সম্পাদক হিসেবে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর তার ও তার স্ত্রী শারমিন সুলতানার মালিকানাধীন ‘জার্নি মাল্টিমিডিয়া’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি অর্থ থেকে ১১ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৭৫ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
শুধু প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর নয়, একই ধরনের জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ জেল/কারা অধিদপ্তরের প্রকাশিত বইয়ের স্বত্ব নিয়েও অনিয়ম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি বইয়ের ক্ষেত্রে মোট প্রায় ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব, সম্পাদকের পরিচয় ও গ্রন্থস্বত্বের বিষয়ে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরিরও গুরুতর অভিযোগ।
নাজমুল হোসেন ও তার স্ত্রী শারমিন সুলতানার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সরকারি অর্থ ও মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার, সরকারি নথি ও তথ্যের কথিত অপব্যবহার এবং মেধাস্বত্ব জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এদিকে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, সচেতন নাগরিক ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে নাজমুল হোসেন ও তার স্ত্রী শারমিন সুলতানাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি, অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তারা রাজপথে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
তবে নাজমুল হোসেন ও শারমিন সুলতানার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

