স্টাফ রিপোর্টার: প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন, সরকারি বড় চাকরি কিংবা ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকও নন, নেই সুনির্দিষ্ট আয়ের কোনো পথ। তবুও অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সাবালিয়া এলাকার স্বামী পরিত্যক্তা লিজা রহমানের। স্বামী পরিত্যক্তার তকমা মুছে এখন তিনি ধনাঢ্য রহস্যময় নারী। একসময় স্বল্প বেতনের গার্মেন্টসকর্মী হলেও এখন নামে-বেনামে প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার এসব সম্পদের উৎস নিয়ে যখন স্থানীয়রা কানাঘুষা শুরু করেছেন, তখনই নিজেকে রক্ষায় গর্ভধারিণী মা, সহোদর ভাই-বোনসহ স্বজনদের আসামি করে একের পর এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগে মামলা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রহস্যময় এই নারী শীর্ষ সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের উচ্চ মহলের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কথা নিজেই বলে বেড়ান বিভিন্ন মহলে।
এলাকার লোকজন বলছেন, স্বামী পরিত্যক্তা লিজা রহমান রাঙামাটি গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ারুল আজিমকে কথিত স্বামী পরিচয়েই যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন। এছাড়াও আব্দুর রহমানসহ আরও তিন ব্যক্তি রয়েছেন তার স্বামী পরিচয়ের তালিকায়। সাম্প্রতিক সময়ে তার আয়ের উৎস নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে বিচলিত লিজা রহমান সম্পদের বড় অংশ বিক্রি করার পাঁয়তারা করছেন। এদিকে তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত আয় তদন্তে দুদকসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সচেতন নাগরিক। দ্রুত সময়ের মধ্যে দুদক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এমন আশা অভিযোগকারীদের।
গণমাধ্যমকর্মীদের অনুসন্ধানে যেসব তথ্য :
জানতে চাইলে লিজা রহমান বলেন, তার যেসব সম্পদ আছে সেগুলো আয়কর ফাইলে দেখানো আছে। শতকোটি টাকার সম্পদের তথ্য ঠিক নয়। তার প্রায় ৪০ কোটি টাকার মতো সম্পদ আছে। বাড়ি, শপিং কমপ্লেক্স, গাড়িসহ সব সম্পদের ফিরিস্তি তুলে ধরে এত সম্পদের দাম কীভাবে মাত্র ৪০ কোটি টাকা, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক সম্পদ তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে করেছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এখনও তার ঋণের পরিমাণ সম্পদের চেয়ে বেশি। কোন ব্যাংক থেকে কত কোটি টাকা ঋণ করেছেন এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
অবৈধ পথে আয়ের কানাঘুষা ঢাকতেই কি আপনি গর্ভধারিণী মা, সহোদর ভাই-বোনদের নামে সাজানো মামলা করেছেন?এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেসরকারি চাকরির জমানো টাকা থেকে এ আয় হয়েছে। অবৈধ পথে আয় করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন, এ বিষয়টি ঠিক নয়। জীবনে তিনি খুব কষ্ট করে সম্পদ করেছেন বলে দাবি করেন লিজা রহমান।
জানা গেছে, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার জশিহাটি গ্রামের নিম্নবিত্ত আজমত তালুকদারের ৩ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে লিজা রহমান ওরফে লিজা তালুকদার দ্বিতীয়। বাবার সংসারে একসময় অতি কষ্টে জীবনযাপন করতেন তারা। এরপর বিয়ে হয়। স্বামী ত্যাগ করে করেন গার্মেন্টসে চাকরি। এরপর আব্দুর রহমানসহ গ্রহণ করেন একাধিক স্বামী। পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনদের নিকট একেক সময় একেকজনকে স্বামী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
জনশ্রুতি আছে, রাঙামাটি গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল আজিমকে কথিত স্বামী পরিচয়েই যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে যান। তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে অবৈধ পথে অর্থ আয় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রহস্যময় এই নারী লিজা রহমান ফুলে-ফেঁপে ওঠার কাহিনি যেন আরব্য রজনীর ড্রামা সিরিজ আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের চেয়েও অভাবনীয় কিছু। তার সম্পদের অ্যালৌকিক সব কারবার নিয়ে এলাকায় কানাঘুষা শুরু হলে অবৈধ আয়ের তথ্য স্বজনরা ফাঁস করে দিয়েছেন, এমন সন্দেহে তাদের নামে মিথ্যা মামলা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
লিজা রহমানের যত সম্পদ;
House No-56, Road No-7/A, Dhanmondi, Dhaka, Urban Lagoon:
2B-মূল্য ১.৫ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রি ২০২৫ (লিজা রহমান)
3B-মূল্য ১.৫ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রি ২০২৬ (রবিউল হাসান-লিজা রহমানের পুত্র)
3C-মূল্য ২.৫ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রি ২০২১ (রবিউল হাসান-লিজা রহমানের পুত্র)
House No-54, Road No-7/A, Dhanmondi, Ahsan Apartment:
5A-মূল্য ২.৩০ কোটি টাকা, রেজিস্ট্রি ২০২৫ (লিজা রহমান)
এছাড়া দেলওয়াতে অবস্থিত জমির পরিমাণ ১০ শতাংশ (লিজা রহমানের নামে), রেজিস্ট্রি ২০২০। কোদালিয়াতে অবস্থিত জমির পরিমাণ ০৫ শতাংশ (লিজা রহমানের নামে), রেজিস্ট্রি ২০২৩।
সাবালিয়া ৩ তলা মোড় এলাকায় জমির পরিমাণ ৫.৫ শতাংশ (লিজা রহমানের নামে), রেজিস্ট্রি ২০০৫।
সাবালিয়া (আমার দক্ষিণ দুয়ার) এলাকায় জমির পরিমাণ ০৫ শতাংশ (লিজা রহমানের নামে), রেজিস্ট্রি ২০২২।
সাবালিয়া (আমার কুঠির) এলাকায় জমির পরিমাণ ০৬ শতাংশ (লিজা রহমানের নামে), রেজিস্ট্রি ২০১৩।
বাসাইল, জশিহাটি মৌজায় জমির পরিমাণ ৫০ শতাংশ (লিজা রহমানের নামে)।
এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবে রয়েছে Toyota Corolla Cross-2025, যার মূল্য ৫৬ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরশমণি সৈয়দ প্লাজা, টাঙ্গাইলে ১৭০ স্কয়ারফুটের দোকান, যার আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ টাকা।
প্রধান ডাকঘর, টাঙ্গাইলে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র, আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ টাকা।
ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, টাঙ্গাইল শাখায় অ্যাকাউন্ট নম্বর 1025002774899 এবং এনসিসি ব্যাংক লিমিটেড, টাঙ্গাইল শাখায় অ্যাকাউন্ট নম্বর 00060310019346-এ এফডিআর ও ডিপিএস হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকা জমা রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
লিজা রহমানের পুত্র রবিউল হাসানের নামে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, টাঙ্গাইল শাখায় অ্যাকাউন্ট নম্বর 1025004265708-এ বিপুল পরিমাণ টাকা জমা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
লিজা রহমানের নিকট গচ্ছিত স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় ২০০ ভরি বলে জানা গেছে।
এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার জশিহাটি গ্রামে একসময় লিজা রহমানদের পৈত্রিক সম্পত্তি তেমন ছিল না। কাজেই পৈত্রিকসূত্রে পাননি কোনো সম্পত্তি। কিন্তু বর্তমানে তার বিভিন্ন ধরনের সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে দেশের বাইরে তিনি বাড়ি করেছেন, এমন প্রচারও রয়েছে।
লিজা রহমানের বিলাসিতা দেখে এলাকাবাসী বিস্ময়ে হতবাক। বিভিন্ন ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে লিজা রহমানের নামে-বেনামে সঞ্চয়পত্র, এফডিআরসহ বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থ জমা আছে বলেও জানা গেছে। যা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর তদন্তে উঠে আসতে পারে।
প্রতিবেশীরা জানান, লিজা রহমান ও তার কথিত স্বামীদের বিলাসী জীবনযাপনের তথ্য। তার রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের উচ্চ মহলের কর্তাদের সঙ্গে সখ্য করে অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তার প্রভাব এখন এতটাই বেশি যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, এমন দম্ভ দেখান তিনি। দুদকের স্থানীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার সখ্যতা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার আয়ের উৎস নিয়ে কেউ বাড়াবাড়ি করলে তাকে মেরে ফেলা হবে, এমন হুমকি তিনি হরহামেশাই দিয়ে থাকেন। কেউ তার আয়ের উৎস নিয়ে কথা বললেই তাকে নানাভাবে হয়রানি করেন।
তার সহোদর বোন বন্যা রেজা অবৈধ আয়ের সকল পথ ও ডকুমেন্টস জানতে পারে, এমন শঙ্কায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে রহস্যজনক কারণে এলাকাবাসী লিজা রহমানের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না। মহল্লা ও এলাকাবাসীর কাছে লিজা রহমান এক রহস্যময় নারী। চিহ্নিত সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে পরিচিত হলেও প্রশাসন অজ্ঞাত কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না, এমন অভিযোগও রয়েছে।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

