আজ , ।   

মুক্তি পেলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিরোধে যাবেন না ইমরান খান

আরো খবর

আলোকিত প্রতিবেদক: কারাগার থেকে মুক্তি পেলে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সেনাবাহিনী কিংবা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সংঘাত বা সংঘাতমূলক অবস্থানে যাবেন না বলে জানিয়েছেন তাঁর দলের শীর্ষ প্রতিনিধি। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) মুখপাত্র ও ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি জানান, শীর্ষ আদালতের আইনি অগ্রগতির পর দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অতীত ভুলে সমঝোতার পথ বেছে নিতে পারে পিটিআই। ইমরান খানকে ‘মহানুভব’ হিসেবে উল্লেখ করে বুখারি বলেন, ইমরান খান কাল মুক্তি পেলে দেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন না তিনি। এর মানে এই নয়, আপনাকে প্রতিষ্ঠানের বা সামরিক প্রধানের মুখোমুখি হতে হবে। দেশের ভালোর জন্য নিজের ক্ষোভ ও কষ্ট চেপে রাখতে হয়।

তাঁর এই বক্তব্যকে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইমরানের দলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো ইঙ্গিতগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বক্তব্যটি এমন এক সময়ে এলো যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান ও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কমানোর সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

এরই মধ্যে ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতির অভিযোগের পর পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দেয়। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আদিয়ালা কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ।

সরকার না সেনাবাহিনী কার সঙ্গে সমঝোতা হচ্ছে:-ইমরান খানের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের তিক্ত সম্পর্ক বেশ পুরানো। ২০২৩ সালের ৯ মে থেকে কারাবন্দী ইমরান খানকে হঠাৎ হাসপাতালে নেওয়ার আদেশে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গনের অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হওয়া ইমরান খান ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০২৩ সালের আগস্টে দুর্নীতির মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রিসহ শতাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, যেগুলোকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড এবং তার কারাবন্দিত্বকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা কঠোরভাবে দমন করে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ।

২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। পরের বছর তাকে গ্রেপ্তার করা হলে সমর্থকেরা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। ওই সময় উত্তেজিত হয়ে তাঁর সমর্থকরা সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালায়। ওই হামলার জন্য ইমরানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে ওই সংঘর্ষের ঘটনায় ইমরানকে ক্ষমা চাইতে বলে সেনাবাহিনী।

তিনি সাংবাদিকদের আরও বলেন, ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে একজন সার্বক্ষণিক মেজর জেনারেলের নেতৃত্বে রেঞ্জার্সরা তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। কিন্তু ৭ মে থেকেই আইএসপিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আহমেদ শরীফ বলেছিলেন, পিটিআইর সঙ্গে যে কোনো সংলাপ হতে পারে যদি দলটি তার ‘নৈরাজ্যের রাজনীতি’র জন্য ক্ষমা চায়। কিন্তু বারবার ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন ইমরান। ওই সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংলাপে বসতেও রাজি ছিলেন না ইমরান।

তবে সম্প্রতি তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। এখন সরকার নয়, সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, সরকারের সঙ্গে আলোচনা নিরর্থক। তাই তিনি শুধু ‘প্রকৃত কর্তৃপক্ষের’ সঙ্গেই আলোচনা করবেন।

ইমরানের সমর্থকদের একটি বড় অংশ মনে করে, সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। ইমরান নিজেও অতীতে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। গত নভেম্বরে তার নামে প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি মুনিরকে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘স্বৈরাচারী একনায়ক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তখন ইমরান বলেছিলেন, তার সঙ্গে যা-ই করা হোক না কেন, তিনি সামরিক নেতৃত্বের কাছে মাথা নত করবেন না। তবে এখন তার দলের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বক্তব্যে ভিন্ন সুর দেখা যাচ্ছে। তাহলে সেনাবাহিনী ও ইমরানের দলের কোনো সমঝোতা হয়েছে?

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, তিনি দৃষ্টিশক্তি হ্রাসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তার আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, ডান চোখে তার মাত্র ১৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি অবশিষ্ট রয়েছে। যদিও সে অভিযোগ অস্বীকার করেছিল পাকিস্তান সরকার।

হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সড়কে ব্যারিকেড বসানো, সাঁজোয়া যান টহল এবং যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আদালত পিটিআইকে হাসপাতালের বাইরে সংবাদ সম্মেলন বা সমাবেশ না করারও নির্দেশ দিয়েছে।

আলোকিত প্রতিদিন/এপি

- Advertisement -
- Advertisement -