বিশেষ লেন, ইউটার্ন, বাসস্ট্যান্ড ও পথচারী পারাপার—বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ঝুঁকি; পুরোনো গবেষণায়ও উঠে এসেছিল নিরাপত্তার ঘাটতি।
মামুন আহমেদ জয়, ঢাকা জেলা প্রতিনিধি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক। রাজধানীর সঙ্গে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। তবে সড়কটির বিভিন্ন অংশের নকশা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ইউটার্ন, বিশেষ লেন, বাসস্ট্যান্ড, সংযোগ সড়ক ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলোতে নিরাপত্তার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা এসব প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে। গত ২৫ জুলাই ধামরাইয়ের ইসলামপুর এলাকায় একটি বিকল বাসকে কেন্দ্র করে একাধিক যানবাহনের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাসড়কের একটি লেনে বাসটি বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর পেছন থেকে আসা যানবাহনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এই দুর্ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—মহাসড়কে কোনো যানবাহন হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে পেছন থেকে আসা যানবাহনকে সতর্ক করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
দুর্ঘটনার দায় কি শুধু চালকের? সড়ক দুর্ঘটনার পর সাধারণত চালকের বেপরোয়া গতি, অসতর্কতা ও ট্রাফিক আইন না মানার বিষয়গুলো সামনে আসে। এসব কারণ দুর্ঘটনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো একটি স্থানে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটলে সড়কের নকশা ও ব্যবস্থাপনাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের পাশাপাশি স্থানীয় যানবাহন, মোটরসাইকেল ও পথচারীদের চলাচল করতে হয়। কোথাও বাসস্ট্যান্ডের কাছেই পথচারীদের রাস্তা পার হতে দেখা যায়। কোথাও আবার সংযোগ সড়ক থেকে যানবাহন সরাসরি মহাসড়কে উঠে আসে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে চালকের পাশাপাশি সড়কের নকশা, দৃশ্যমানতা, ইউটার্ন, লেন বিভাজন ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ লেন নিয়ে প্রশ্ন-যানজট কমানো ও যানবাহনের চলাচল সহজ করতে ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ লেন ও বিভাজক ব্যবস্থার ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কোনো লেনে কংক্রিটের বিভাজক থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে যানবাহন কীভাবে নিরাপদে সরে যাবে, বিকল গাড়ি দাঁড়ালে পেছনের যানবাহন কত দূর থেকে সেটি দেখতে পাবে এবং লেন পরিবর্তনের পর্যাপ্ত সুযোগ আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যানজট কমানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমানোর বিষয়টি কি একই গুরুত্বে বিবেচনা করা হয়েছে?
পুরোনো গবেষণাতেও নিরাপত্তার ঘাটতি- ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে আগের বিভিন্ন গবেষণায়ও ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় পুলিশি দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের প্রায় ৭৫ কিলোমিটার অংশে বছরে প্রায় ১৮০টি দুর্ঘটনা ও ১২০ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যানবাহন চলাচলের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এগুলো পুরোনো তথ্য। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি তুলনা করতে হলে ২০২৬ সালের হালনাগাদ সরকারি দুর্ঘটনা ও যানবাহন চলাচলের তথ্য প্রয়োজন।
আরও আগে, ধামরাই থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার সড়কে পথচারী নিরাপত্তা নিয়ে করা এক গবেষণায় প্রায় ৯০ শতাংশ অংশকে ২-স্টার এবং মাত্র ৯ দশমিক ৬ শতাংশ অংশকে ৩-স্টার রেটিং দেওয়া হয়েছিল।
গবেষণায় পথচারী চলাচলের পৃথক ব্যবস্থা, নিরাপদ পারাপার, সড়কবাতি ও ট্রাফিক সাইনেজের ঘাটতির বিষয়ও উঠে এসেছিল।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থায়ী সমাধান কোথায়- সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে সেটিকে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে কারণ অনুসন্ধান করা হয়।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক নিয়ে আগের এক গবেষণায় দেখা যায়, মহাসড়কের মাত্র ১০টি স্থানে প্রায় ২৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এসব স্থান পুরো গবেষণাধীন সড়কের প্রায় ৩ শতাংশের মতো অংশজুড়ে ছিল।
এ ধরনের তথ্যের অর্থ হলো, দুর্ঘটনার ঝুঁকি সব জায়গায় সমান নয়। তাই নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে সেসব জায়গায় প্রকৌশলগত পরিবর্তন আনা গেলে দুর্ঘটনা কমানোর সুযোগ রয়েছে।
রোড সেফটি অডিটের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে কতটা- ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক নিয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও রোড সেফটি অডিট করা হয়েছে। অডিটে সড়কের বিভিন্ন অবকাঠামো, বাস-বে, সেতু, কালভার্ট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, ওই অডিটে চিহ্নিত ঝুঁকিগুলোর কতগুলো ইতিমধ্যে দূর করা হয়েছে?
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অডিট করলেই হবে না। অডিটে পাওয়া ত্রুটি সংশোধনের পর আবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেছে কি না।
রাতে বাড়ে ঝুঁকি-মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকা বা আলো অপর্যাপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাতের বেলায় দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে অন্ধকার সড়ক, পথচারী ও স্থানীয় যানবাহনের চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এর সঙ্গে যদি সড়কের লেন মার্কিং অস্পষ্ট হয় কিংবা সতর্কতামূলক সাইন দেখা না যায়, তাহলে চালকের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
কী করা প্রয়োজন-ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাই অংশে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ রোড সেফটি অডিট করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগপথ। এই সড়কে যানবাহনের গতি ও সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একটি দুর্ঘটনার পর চালককে দায়ী করা সহজ। কিন্তু একই স্থানে বারবার দুর্ঘটনা হলে প্রশ্ন ওঠে—সড়কটি কি যথেষ্ট নিরাপদভাবে নকশা করা হয়েছে? ইউটার্ন, লেন, বাসস্ট্যান্ড, সংযোগ সড়ক ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা কি বর্তমান যানবাহনের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন হালনাগাদ তথ্য, স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ।
কারণ মহাসড়ক প্রশস্ত বা আধুনিক হলেই সেটি নিরাপদ হয় না। মানুষ যাতে নিরাপদে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত একটি মহাসড়কের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত স্থায়ী সমাধান করা গেলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে—এটাই এখন স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

