নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতির তোয়াক্কা না করে রোড রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ শেখার অজুহাতে সুইডেন ভ্রমণের আয়োজন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাঁচ কর্মকর্তা। অথচ এই রোলারগুলো গত মার্চ মাসেই সরবরাহ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সরবরাহের পাঁচ মাস পর মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার যোগসাজশে ‘প্রমোদভ্রমণের এই আয়োজন’ করা হয়েছে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে।
মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী, আগামীকাল থেকে আগামী ৩ আগস্ট পর্যন্ত উল্লিখিত কর্মকর্তাদের সুইডেন সফরের কথা রয়েছে। তাঁরা হলেন:
- মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান: স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একান্ত সচিব
- আশরাফুল আমিন: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব
- জসীম উদ্দিন: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী
- আশিকুল ইসলাম: নির্বাহী প্রকৌশলী
- মুহাম্মদ ইমরান হোছাইন খোকা: নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব)
চসিকে পাঁচটি ডাবল ড্রাম রোলার সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদ। এর ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
পূর্বশর্ত: চুক্তি অনুযায়ী, রোলারগুলো বিদেশ থেকে জাহাজে ওঠার আগে তিনজন কারিগরি ব্যক্তির (টেকনিক্যাল পার্সন) প্রি-শিপমেন্ট পরিদর্শনের শর্ত ছিল।
প্রশিক্ষণের প্রাথমিক শর্ত: এছাড়া রোলার সরবরাহের সাত দিনের মধ্যে চট্টগ্রামে কর্মস্থলে একজন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং প্রতিটি রোলারের জন্য একজন চালকের একদিনের প্রশিক্ষণের কথা ছিল। এর জন্য ১৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা বহন করার কথা ছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবির আহমেদের।
প্রাথমিক অনুমোদন ও স্থগিতাদেশ: রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণের জন্য ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর বিদেশ ভ্রমণের একটি অনুমোদন দিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত করে। সেসময়ের আদেশে চসিকের চার কর্মকর্তার সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবদুর রহমানের নাম ছিল।
নতুন আদেশ ও রদবদল: গত ৬ জুলাই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত নতুন ভ্রমণ অনুমোদন আদেশে আবদুর রহমানের নাম বাদ দিয়ে মন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নাম যুক্ত করা হয়।
মেয়াদ বৃদ্ধি: আগের আদেশে সফরের মেয়াদ ৭ দিন থাকলেও নতুন আদেশে তা বাড়িয়ে ১০ দিন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চসিকের কর্মকর্তারা এই বিষয় প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত খায়েশ মেটাতে নতুন করে বিদেশ ভ্রমণের জিও (সরকারি আদেশ) জারি করা হয়েছে। ঠিকাদার কর্তৃক রোলার সরবরাহের প্রায় ৫ মাস পর কর্মকর্তাদের এমন বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া মন্ত্রণালয় ও সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রাস্তায় রোলার চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের জ্ঞান লাভ করে তা আদতে কোথায় প্রয়োগ করবেন, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
প্রধানমন্ত্রীর পূর্বের অনুকরণীয় সিদ্ধান্ত বনাম বর্তমান পরিস্থিতি
চসিকের বিদেশ ভ্রমণ বাতিল: গত জুন মাসে বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে মশা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য চসিক মেয়র ও কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই প্রস্তাবে বিদেশ সফরের কোনো শর্ত না থাকলেও তা আটকে দেওয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীর অনুকরণীয় মন্তব্য: প্রধানমন্ত্রী সেসময় লিখেছিলেন, “দেশেই সন্ধ্যার পর কোনো ডোবানালার পাশে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব।” তাঁর সেই বাস্তবমুখী ও ব্যয় সংকোচনমূলক সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।
অথচ ঠিক তার কিছুদিন পরই, রোড রোলার চালানো শেখার মতো হাস্যকর অজুহাতে একই সিটি করপোরেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিদেশ সফরে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

