আজ রবিবার, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ।   ৫ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দোহাজারী কক্সবাজার রেলপথ: পরিকল্পনা থেকে সফল বাস্তবায়নের অন্তরালের গল্প!

আরো খবর

মো: জহির উদ্দিন বাবর: দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল রেলপথে সরাসরি কক্সবাজার পৌঁছানোর। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের মাধ্যমে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পনা, নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি, জমি অধিগ্রহণ, প্রকৌশলগত জটিলতা এবং নানা প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

তবে এই প্রকল্পের ইতিহাস শুধু একটি রেললাইন নির্মাণের নয়; এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ারও একটি উদাহরণ। বিশেষ করে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিনের সমন্বয়মূলক ভূমিকা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় এসেছে।

২০১০ সালের ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত একনেক সভায় “দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন গুন্দুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ” প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে।

তৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল শুধু কক্সবাজারকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা নয়; বরং ভবিষ্যতে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপন করা। সে কারণে মূল প্রকল্পে রামু থেকে সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একাধিকবার প্রকল্প সংশোধন, নকশা পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ, সময় বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছে।

যদিও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মানের রেল অবকাঠামো, বড় আকারের সেতু, কালভার্ট এবং আন্তর্জাতিক মানের স্টেশন নির্মাণ, যা ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে দেশের অন্যতম আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, একাধিক নতুন স্টেশন, শতাধিক সেতু ও কালভার্ট এবং অত্যাধুনিক রেল অবকাঠামো। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দুটি প্যাকেজে সম্পন্ন হয়। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে রেলপথটির উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পর্যটন নগরী কক্সবাজার সরাসরি রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়।

প্রকল্পের শুরুতে রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগে অগ্রগতির অভাব এবং অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় প্রকল্পটির ওই অংশ পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয়, বর্তমান বাস্তবতায় গুন্দুম অংশ বাস্তবায়নের পরিবর্তে দোহাজারী–কক্সবাজার অংশ সম্পন্ন করাই অধিক কার্যকর হবে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প পরিচালক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিন প্রশাসনিক সমন্বয়, বাস্তবায়ন তদারকি এবং নীতিগত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

সূত্রগুলো জানায়, তাঁর সময়েই প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নের শেষ ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ জোরদার করা হয়।

একই সময়ে রামু–গুন্দুম অংশের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবসম্মততা নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের আর্থিক দিক বিবেচনায় ওই অংশ মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি দেশের পর্যটন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একটি যুগান্তকারী অবকাঠামো।

এই রেলপথ চালুর ফলে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কক্সবাজারে যাতায়াত সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে।

যদিও রামু–গুন্দুম অংশ আপাতত বাস্তবায়িত হয়নি, সংশ্লিষ্টরা মনে করেন ভবিষ্যতে মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুনরায় সেই পরিকল্পনা বিবেচনা করতে পারে।

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ তাই শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের সফল সমাপ্তি নয়; এটি দীর্ঘ পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সমন্বয়, বাস্তবতার সঙ্গে নীতিগত অভিযোজন এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

আলোকিত প্রতিদিন/এপি

- Advertisement -
- Advertisement -