স্পোর্টস ডেস্ক: ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে। এই সময়টাতে বাংলাদেশে রাত কখনো শুধু রাত থাকে না। ঘুমন্ত শহরের ভেতরেও তখন টেলিভিশনের আলো জ্বলে ওঠে। চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে। যেদিকেই তাকাবেন কোথাও না কোথাও নীল-সাদা পতাকা দেখবেনই। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না কিন্তু বিশ্বকাপ এলে আমরা যেন অন্য এক মানচিত্রে ঢুকে পড়ি। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার রঙে ভাগ হয়ে যায় পাড়া, পরিবার, বন্ধুমহল, অফিস, ক্যাম্পাস, চায়ের দোকান।
এই বিশ্বকাপে সেই পুরোনো আবেগ আবার ফিরছে। কারণ মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা। মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টিনা তাদের বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করবে আলজেরিয়ার বিপক্ষে। ম্যাচটি হবে ক্যানসাস সিটিতে। ম্যাচের সময় ১৭ জুন ০১:০০ ইউটিসি। বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা। অর্থাৎ এবার আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ দেখতে আমাদের রাতভর জেগে থাকতে হবে না। কিন্তু মেসির বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশে শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। তার আগে রয়েছে অনেক প্রস্তুতি। নতুন জার্সি কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক, কিছু পুরনো পরিসংখ্যান ঘেঁটে নেওয়া, আগেভাগে সব কাজ সেরে রাখা। এসব মিলেই এক ধরনের রাতজাগা উৎসব। এই উৎসবের কেন্দ্রে একজন মানুষ। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
আমাদের অনেকেই বেড়ে উঠেছি মেসিকে দেখে। রাতের পর রাত কেটেছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল তর্ক করে। প্রথম বেতন দিয়ে কিনেছি মেসির জার্সি। বাংলাদেশে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, মেসি আমাদের জীবনের সাথে মিশে থাকা একটা নাম যার সাথে আমরা বড় হয়েছি।
কিন্তু এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আবেগ একটু আলাদা। এবার আর্জেন্টিনা শুধু বিশ্বকাপ খেলছে না তারা শিরোপা রক্ষার মিশনে নেমেছে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল টানা দুইবার পুরুষদের বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আর্জেন্টিনার সামনে তাই ইতিহাসের কঠিন দরজা। স্কালোনির দল ২০২২ সালের অনেক চেনা মুখ নিয়েই এসেছে। মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, রোমেরো, দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, লাউতারো মার্তিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজরা আছেন। আবার নতুন প্রজন্মের কয়েকজনও আছে যারা হয়তো মেসির পরের আর্জেন্টিনার গল্প লিখবে। তবে বাংলাদেশের চোখ থাকবে মেসিতে।
এই বিশ্বকাপ হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো নয়। ফুটবল কখনো নিশ্চিত কথা বলে না। কিন্তু বয়স, সময়, শরীর, ইতিহাস- সব মিলিয়ে আমরা জানি এবারের বিশ্বকাপই হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপ। ২০২২ সালের মেসিকে আমরা দেখেছিলাম পূর্ণতার পথে। ২০২৬ সালের মেসিকে আমরা দেখছি বিদায়ের আলোয় দাঁড়িয়ে। তিনি জিতবেন নাকি জিতবেন না, গোল পাবেন নাকি পাবেন না, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারবে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর সময় দেবে। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত- বাংলাদেশ আবার মেসির জন্য অপেক্ষা করবে।
কারণ মেসি আমাদের অনেক রাত জাগিয়েছেন। অনেক হতাশা দিয়েছেন। অসম্ভব আনন্দও দিয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন বারবার হারলেও গল্প শেষ হয় না। ২০১৪ সালের কান্না ২০২২ সালের হাসিতে বদলে যেতে পারে। নীরব স্বভাব আর অল্প কথার মানুষও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে সবচেয়ে বড় উত্তর দিতে পারেন। মেসির ক্যারিয়ারটা তাই কেবল প্রতিভার গল্প নয়। মেসির গল্পটা অপেক্ষা, ধৈর্য, বিনয় আর অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করার।
বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কখনো বুয়েনস আইরেস দেখেনি। রোসারিওর পথ চেনে না। আর্জেন্টিনার ভাষা জানে না। তবু মেসি গোল করলে এই দেশে মানুষ চিৎকার করে ওঠে। আর্জেন্টিনা হারলে আমাদেরও মন খারাপ হয়। মেসি হাঁটলে কেউ ভাবে তিনি ক্লান্ত কি না। মেসি হাসলে মনে হয় নিজের ঘরের কেউ ভালো আছে।এই অনুভূতির কোনো নাম নেই। কোনো মানে নেই।
তাই আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ নয়। এটি বাংলাদেশের মেসি-অধ্যায়ের আরেকটি সকাল। রাতভর না জাগলেও, আবেগে জেগে থাকবে বাংলাদেশ। কেউ রাস্তার পাশের দোকানে চা বানাবে। কেউ অফিসে যাওয়ার আগে টিভি খুলবে। কেউ মোবাইলে লাইভ স্কোর দেখবে। কেউ পুরোনো জার্সি পরে বসবে। আর যখন মেসি মাঠে নামবেন তখন সবার চোখ থাকবে আমেরিকার ক্যানসাস সিটি স্টেডিয়ামে।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

