আলোকিত প্রতিবেদক: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে দেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তরের ‘মহা-পরিকল্পনা’ নিয়ে আসছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও সর্বজনীন করার এই যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খননসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন করে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে এই নিরাপত্তা জালের আওতায় আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও অরক্ষিত (ভালনারেবল) জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতার পরিমাণ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা উভয়ই বাড়ানো হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় মোট ১৮টি ভাতা এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের চেয়ে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে ১১ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা। সামাজিক সুরক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা করা হচ্ছে। সামাজিক সহায়তা খাতে চলতি অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেখান থেকে বৃদ্ধি করে আগামী অর্থবছরে সামাজিক সহায়তা খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা।
জানা গেছে, বিএনপির প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির বিস্তৃতির পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লাইফ-সাইকেলভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে কল্যাণকর রাষ্ট্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা আগামী বাজেটে তুলে ধরতে যাচ্ছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে খণ্ডিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থা থেকে সরে এসে সব নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে ১১ জুন জাতীয় সংসদে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর ঘোষণা দেবেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পর্যায়ক্রমে সব নাগরিককে আজীবন সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সব নাগরিককে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছেন। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি মানুষকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত ও নির্বাচিত প্রতিটি খাতে ধীরে ধীরে মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
বিএনপির ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া, খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন করে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হবে। নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তাভিত্তিক ১৮টি কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৬৩ লাখে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে প্রথমবারের ফ্যামিলি কার্ড বাবদ ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ৪১ লাখ কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। পাশাপাশি ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে দেওয়া হবে বিশেষ ‘কৃষক কার্ড’, যার মাধ্যমে কৃষকরা বছরে ২৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাবেন। অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে খাল খনন কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ২৬ লাখ ৬৭ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৪ লাখ ২ হাজারে উন্নীত করা হচ্ছে।
আগামী বাজেটে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ ও সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে প্রবীণদের সুরক্ষায়। বিশেষ করে ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য এবার বাড়তি ভাতার ঘোষণা থাকছে। বর্তমানে ৬১ লাখ নাগরিক প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পেলেও আগামী বাজেটে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৬২ লাখ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের ভাতার সংখ্যা বাড়ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশেষ করে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীকদের মাসিক ভাতা বাড়ানো হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে নতুন করে পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বিনিয়োগ সংকটের এই সময়ে বাজেটে হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মাধ্যমে পরিবারের সবচেয়ে অবহেলিত ও কঠোর পরিশ্রমী মানুষটির (নারী) প্রতি নজর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া এবারের বাজেটের লক্ষ্য। কৃষক ও সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ক্ষমতায়ন এবং বেসরকারি খাতের জন্য নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ তৈরি করাও বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বাজেটে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকেছে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং বিনিয়োগ সংকট বাড়ছে, সেখানে প্রথমেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। আমরা দেখেছি পরিবারের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ হচ্ছেন গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী। তিনি সবার শেষে ঘুমান, সবার আগে ওঠেন, কিন্তু তার কোনো সামাজিক বা আর্থিক মূল্যায়ন নেই। কারণ তার নিজস্ব আয় নেই। এ কারণে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় সরাসরি নারীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হচ্ছে কৃষক। তাদের জীবনমান উন্নত না হলে কৃষিও এগোবে না।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

