শিমুল রেজা, চুয়াডাঙ্গা: দেশের সবগুলো চিনিকলে যখন লোকসান হচ্ছে তখন সরকারকে প্রচুর রাজস্ব দিয়েও মুনাফা অর্জন করছে দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি। চুয়াডাঙ্গা তথা এ অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি কেরু চিনিকল। এশিয়া মহাদেশের ২য় বৃহত্তম ও বাংলাদেশের সর্ববৃহত্তম ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি সোনালী অতিত ঐতিহ্য রয়েছে। এই বৃহত্তর শিল্প প্রতিষ্ঠানটিতে বিগত দিনে নানা অনিয়ম দুর্নীতি দ্বায়িত্ব পালনে ডিস্টিলারি থেকে মদ চুরি সহ বিভিন্ন সিন্ডিকেট বানিজ্যর অভিযোগ বেশ আগে থেকেই। কেরু ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান, যোগদানের মাত্র ১ বছর ৮ মাস দায়িত্ব পালন করেই বদলে দিয়েছেন সকল প্রকার সিন্ডিকেট টেন্ডার বানিজ্যসহ- নানান অনিয়ম, এই অনিয়ম দূর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করার ফলে আগের তুলনায় অনেকটা লাভজনক অবস্থানে পৌঁছিয়েছে, সুগার মিলটির ডিস্টিলারি বিভাগের লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া, কেরু’র শ্রমিক সংকট সমাধান, রাসায়নিক ও জৈব কারখানার উন্নয়ন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পূর্বের তুলনায় জোরদারের জন্য বিভিন্ন পয়েন্ট সিসি টিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, সীমানা প্রাচীরের উপরে কাঁটাতার বসানো, ডিস্টিলারী কারখানার পিছন দিকে কাঁটাতারের প্রাচীর স্থাপন, কেরু সীমানা সংলগ্ন বিভিন্ন ধরণের গলি বন্ধ-সহ পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে ডিস্টিলারী ইউনিটে রিকোভারী বৃদ্ধি পেয়েছে, চিনি কারখানার রিকোভারী গত অর্থ বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করায় জৈব সার ও ভিনেগার ক্রয় বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা প্রায় নয় দশকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বেশ কিছু দৃশ্যমান কাজ করে প্রশংসায় প্রশংশিত কেরু এ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি) একডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে। এরমধ্যে অধিকাংশই চিনি কলগুলোর ৬০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হয়েছে, বিএসএফআইসির অধীনে ১৫টি চিনিকলের মোট পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৫৬.৮৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে জয়পুরহাট চিনিকলে। দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান দ্বায়িত্ব গ্রহণের পর দৃশ্যপট পরিবর্তন, দেখা গিয়েছে সেখানে ছিল একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান কেরু। আধুনিকতার ব্যাপক উন্নয়নের ছোয়া লাগতে শুরু করেছে। ডিস্টিলারী কারখানাটিরো ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। মিলটি আধূনিকায়ন, ডিস্টিলারী কারখানায় অটোমেশিন স্থাপন সহ বিভিন্ন উন্নয়নের কাজ শেষ হয়েছে সম্প্রতি সময়ে।
দেশের প্রাচীনতম চিনি প্রস্তুতকারকদের মধ্যে অন্যতম কেরু এ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৮ সালে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭৩ সালে সরকার ডিস্টিলারিটিকে জাতীয়করণ করে। চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে দর্শনায় অবস্থিত দেশের একমাত্র লাইসেন্সধারী ডিস্টিলারি প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড তার বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটিই কেরুর চিনিগুড়া থেকে উৎপাদিত সর্বোচ্চ পরিমাণ স্পিরিট এবং অ্যালকোহলের উৎপাদন করে। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কড়াকড়ির কারণে বিদেশি মদের আমদানি কমে যাওয়ায় স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত মদের চাহিদা বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে আর এতে বিক্রি বেড়ে যায়। “যাত্রা শুরুর পর থেকে এত পরিমাণ লাভের মুখ দেখেনি কেরু। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মদের উৎপাদন বেড়েছে।”
সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু এ্যান্ড কোম্পানির মূল পণ্য চিনি উৎপাদনে ৬২ কোটির বেশি লোকসান গুনেও প্রতিষ্ঠানটি সামগ্রিক ভাবে অর্জন করেছে ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকার নিট মুনাফা। আর এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে তাদের ডিস্টিলারি বিভাগ, যেখানে শুধু মদ বিক্রি থেকেই এসেছে ১৯০ কোটি আট লাখ ২৯ হাজার টাকার আয়।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেখা গেছে, সরকারকে ১৪০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব ও ভ্যাট প্রদান এবং চিনি খাতের লোকসান সমন্বয় করার পরও প্রতিষ্ঠানটি বড় অঙ্কের লাভে রয়েছে। ফলে ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরু অ্যান্ড কম্পানি এবার ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মুনাফার রেকর্ড গড়েছে।
কেরু এ্যান্ড কোম্পানির প্রধান পণ্য চিনি। তবে আখ থেকে চিনি নিষ্কাশন করার পর বিভিন্ন উপজাত পণ্যও (বাই-প্রোডাক্ট) উৎপাদন করা হয়। যেমন মদ, ভিনেগার, স্পিরিট এবং জৈব সার। প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় মদ,পরিশোধিত স্পিরিট এবং বিকৃত স্পিরিট উৎপাদন করে থাকে। পাশাপাশি, দুই প্রকার ভিনেগার মল্ট ভিনেগার এবং সাদা ভিনেগারও তৈরি করে থাকে। এর কারখানাগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ১.৩৫ কোটি প্রুফ লিটার। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি ইউনিটে রয়েছে ৯ প্রকারের মদ— ইয়েলো লেবেল মল্টেড হুইস্কি, গোল্ড রিবন জিন, ফাইন ব্র্যান্ডি, চেরি ব্রান্ডি, ইম্পেরিয়াল হুইস্কি, অরেঞ্জ কুরাকাও, জারিনা ভদকা, রোসা রাম এবং ওল্ড রাম। ১৮০ মিলি, ৩৬৫ মিলি এবং ৭৫০ মিলির বোতলে মদ বিক্রি করে কেরু। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির সবগুলো নির্ধারিত গুদামে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা এবং সিলেটের শ্রীমঙ্গলের গুদামগুলো অর্ডারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে। প্রতিটি কেসে ৭৫০ মিলির ১২ বোতল, ৩৬৫ মিলির ২৪ বোতল বা ১৮০ মিলির ৪৮ বোতল মদ থাকে।
ডিস্টিলারি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক রাজিবুল হাসান জানান, চলিত অর্থ বছরের স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। উৎপাদনে অটোমেশন চালু করা এবং আধুনিক বোতলজাত প্রক্রিয়া গ্রহণের ফলে উৎপাদন বেড়েছে, বিক্রি বেড়েছে, একই সঙ্গে পণ্যের মানও উন্নত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কেরু এ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কেরু এ্যান্ড কোম্পানি একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান,মদের পাশাপাশি চিনি খাতেও প্রত্যাশিত সাফল্য পূরণে অটোমেশিনে উৎপাদন শুরু হয়েছে। মাননীয় শিল্প মন্ত্রী , শিল্প সচিব মহোদয় ও বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান এর সার্বিক দিকনির্দেশনায় মোতাবেক, দেশের ঐতিহ্যবাহী চিনি শিল্প এই কেরু এ্যান্ড কোম্পানি অন্যান্য পণ্যে উৎপাদন সহ এই চিনি শিল্পকে এগিয়ে নিতে এবং সর্বোচ্চ লাভজনক হিসাবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।
ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। যার মধ্যে আখের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে, ভালো মানের বীজ নির্ধারণসহ কৃষি কাজে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। আগের তুলনায় এবার চিনিকলের লোকসানের কমে আসবে এবং আগামীতে তা লাভজনক হিসাবে রুপান্তরিত হবে বলে আমি আশাবাদী। সরকারের মূল্যবান সম্পদ কেরু চিনিশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বেশী বেশী আখচাষের কোন বিকল্প নেই। আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের এলাকার আখচাষি, ডিলার, শ্রমিক-কর্মচারি, কর্মকর্তা ও শুভানুধ্যায়িদের। সাথে নিয়ে সর্বোচ্চ লাভের দিকে অগ্রসর হবে কেরু ইনশাআল্লাহ।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

