আজ বুধবার, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ।   ৬ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হরমুজ সংকটে নতুন মোড়: ট্রাম্পের ঘোষণায় ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত

আরো খবর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ইরানের অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার করাতে যুক্তরাষ্ট্র যে “প্রোজেক্ট ফ্রিডম” চালু করেছিল, তা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, প্রকল্পটি “স্বল্প সময়ের জন্য” বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, উভয় পক্ষের সম্মতিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে চলমান পরিস্থিতিতেও কোনো সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরের সুযোগ তৈরি হয়। ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা পাকিস্তানের অনুরোধেই এই বিরতির সিদ্ধান্ত এসেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রকল্প স্থগিত থাকলেও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকবে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই সিদ্ধান্তকে “ইরানের বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। আরব উপসাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্ত করা প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিচালিত হয়। চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার সময় এই প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে ইরান। এর ফলে শতাধিক জাহাজ আটকে পড়ে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়। আটকে থাকা জাহাজগুলোকে নিরাপদে পার করানোর লক্ষ্যে গত ৪ মে “প্রোজেক্ট ফ্রিডম” ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তবে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই প্রকল্পই আপাতত স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিল যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন।

অন্যদিকে ইরানি রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি গণমাধ্যম দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশের জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধ আরোপ করে এবং সামরিক নিরাপত্তা জোরদার করে।

এদিকে ইরান সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলীয় অঞ্চলের বড় অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে, যা ফুজাইরা ও খোরফাক্কান বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে দাবি করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের দাবি আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে এবং বাণিজ্যিক রুটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শেষ হয়েছে এবং নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তিনি নতুন কোনো সামরিক অভিযান না চাওয়ার কথা উল্লেখ করে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং সাময়িক।

হরমুজ সংকটের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই অবিলম্বে পূর্ণ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই সংঘাত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চীন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।

এদিকে সংঘাত শুরুর সময় থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও বর্তমানে যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র, তবু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল ঘিরে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কমেনি।

বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, সেখানে চলমান এই অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

- Advertisement -
- Advertisement -