আজ বুধবার, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ।   ৬ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার স্মরণসভা-রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে

বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস কথিত আনোয়ারা ফাউন্ডেশন-এর নাম ব্যবহার

আরো খবর

এম জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম মহানগর বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যাণ পরিষদের সভাপতি, আনোয়ারার চাঁদাবাজ ইদ্রিস প্রকাশ মাহাতা গ্রামের ভদাইয়ার নানা অপকর্মের ঘটনায় চট্টগ্রাম নগর তথা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সচেতন মহলের মাঝে আবারও শুরু হয়েছে তুলকালাম কান্ড। এতদিন যারা ইদ্রিসের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মুখ খোলার সুযোগ পায়নি তাদের মধ্যে ইদ্রিসকে নিয়ে নতুন করে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। সবার দৃষ্টিতে ইদ্রিস একজন পেশাদার চাঁদাবাজ ও পেশাদার প্রতারক। জাতির বীর সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের অহংকার ব্যবহার করে ইদ্রিস সেই দেশ স্বাধীনের সূচনালগ্ন থেকে চাঁদাবাজি, টাউটারি, প্রতারণার ব্যবসায় হাল ধরে। কথিত সংগঠন ‘আনোয়ারা ফাউন্ডেশন’সহ বিভিন্ন ভূঁইফোড় সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সচ্ছল ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণসভা, সচ্ছল রাজাকার পরিবারে ক্রেষ্ট বিক্রি করা তার পেশা। তার অধীনে রয়েছে অর্ধ শতাধিক দালাল। এসব দালালগুলো তার একান্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকেন। দালালদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের মাহমুদ, পরৈকোড়া গ্রামের ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চৌধুরী, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আহমদুর রহমান, আবু জাফর প্রকাশ ঘোড়া জাফর, প্রাক্তন শিক্ষক আবুল কালাম, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক সহ অনেকে। ইতিমধ্যে ইদ্রিসের সৃষ্টি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চৌধুরী পরলোকগমন করেছেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকার) নির্দেশে আনোয়ারা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ বিগত ২০১৪ সালে লিখিত অভিযোগ জানালে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চৌধুরীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন। চলতি বছর (২০২৬) এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সুভাষ চৌধুরী মৃত্যুবরণ করলে ভূয়া প্রমাণিত হওয়ায় আনোয়ারা উপজেলা প্রশাসন সুভাষ চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা গার্ড অব অনার দেয়নি। অভিযোগ রয়েছে যে- ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগের শাসনামলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডারের পদটির অপব্যবহার করে সচ্ছল রাজাকার পরিবার ও সচ্ছল অমুক্তিযোদ্ধা পরিবার থেকে মোটা দাগের টাকা নিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা বানাতেন, রাজাকার দেখে দেখে মুক্তিযোদ্ধা বানাতেন চাঁদাবাজ ইদ্রিস। মূলতঃ আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী- প্রভাবশালী নেতাদের নাম বিক্রি করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বৈধ কমান্ডার দাবী করে ইদ্রিস সমগ্র চট্টগ্রামে নানান অপকর্ম চালাতেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণের একাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, ইদ্রিস চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে স্বঘোষিত কমান্ডার ছিলেন। তিনি কখনো বৈধ কমান্ডার ছিলেন না। এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চেয়ে মুহাম্মদ ইদ্রিসের সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আমাকে যারা চাঁদাবাজ বলে- প্রতারক বলে, টাউট বলে তারাই হচ্ছে প্রকৃত চাঁদাবাজ- প্রকৃত প্রতারক। ইদ্রিস বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে যা-ই বলুক না কেন, আমি ইদ্রিস সৎপথে আছি। কথিত মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিসের বিরুদ্ধে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার অভিযোগ। উপজেলার পাঠানিকোটা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন দাশ, পিতা- যোগেন্দ্র দাশ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে সশস্ত্র ট্রেনিং এর জন্য ভারত চলে যান। ভারতের হরিনা ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং গ্রহণ করে এফএফ যোদ্ধা হিসেবে দেশে ফিরেন সাধন দাশ। দেশের বাড়িতে দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতির বিষয় মা-বাবা, ভাই- বোন, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীকে জানিয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়বেন এ ছিলো সাধন দাশের উদ্দেশ্য । মা-বাবা ভেবেছিলো সাধন দাশরা দেশ স্বাধীন করেই ঘরে ফিরবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কথিত মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস সাধন দাশ গ্রামের বাড়িতে আসার খবর পেয়ে সাধন দাশের বাড়ির আশেপাশে তার সশস্ত্র সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে অবস্থান করছেন। মুক্তিযোদ্ধা সাধন দাশ বাড়িতে প্রবেশের সাথে সাথে ইদ্রিসরা তাঁকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পাশের ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। স্থানীয়রা পরে জানতে পারলো যে- বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন দাশের এক বোনকে ইদ্রিস রীতিমতো নির্যাতন করতো। বোনের নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে পারে সাধন দাশ, এ ভয়ে সাধন দাশকে ইদ্রিস এলোপাতাড়ি কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। কথিত মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিসের বিরুদ্ধে এমনিতেই রয়েছে পাহাড় সমান অভিযোগ। পরৈকোড়া গ্রামের সুভাষ চৌধুরী যেভাবে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণিত : মুহাম্মদ ইদ্রিসের মুক্তিবার্তা নম্বর ছিলো দুটি। মুক্তিবার্তা নম্বর ০২০২০২০০০৩ তার আরেকটি মুক্তিবার্তা নাম্বার ছিলো ০২০২০২০২৩৬-এ মুহাম্মদ ইদ্রিস, পিতা- নুর আহমদ, গ্রাম- মাহাতা, থানা- আনোয়ারা, জেলা- চট্টগ্রাম। ইদ্রিস অর্থের লোভে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কোনো তালিকায় নাম নেই এমন একজন ব্যক্তির নাম সুভাষ চৌধুরী, পিতা- দূর্গা কুমার চৌধুরী, গ্রাম- পরৈকোড়া, থানা- আনোয়ারা, জেলা- চট্টগ্রামকে মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়ে মুহাম্মদ ইদ্রিসের মুক্তিবার্তা ০২০২০২০২৩৬ টি সুভাষ চৌধুরীর নামে ব্যবহার করে ২০১৪ হতে সন্মানী ভাতা উত্তোলন করে আসছিল তিনি (সুভাষ চৌধুরী)। সুভাষ চৌধুরীর ভাতার বই নম্বর ছিলো ২৪০, সোনালী ব্যাংক আনোয়ারা শাখার হিসাব নম্বর ছিলো ০০২৩০২৪৬। আগেই বলা হয়েছে যে আনোয়ারা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ সুভাষ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিযোগে দিলে উপজেলা প্রশাসন ও সোনালী ব্যাংক কতৃপক্ষ তার সন্মানি ভাতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। ইদ্রিস ও সুভাষ চৌধুরীর বিষয়ে শিলাইগড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পরৈকোড়া ইউনিয়নে সুভাষ চৌধুরী নামের কোনো মুক্তিযোদ্ধা নাই। তিনি বলেন, ইদ্রিস নামের এক ব্যক্তি জালজালিয়াতি করে সুভাষ চৌধুরীকে মুক্তিযোদ্ধা খাতায় তালিকাভুক্ত করেছে। এসব নিয়ে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালীন আনোয়ারা থানা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাষ্টার শামসুল আলম বলেন মাহাতা গ্রামের ইদ্রিস হলো ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা বানানোর প্রধান কারিগর। তিনি বলেন, বারখাইন গ্রামের আবু তাহের মাহমুদ, পরৈকোড়া গ্রামের সুভাষ চৌধুরী, বারখাইন গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার শামসুল করিম চৌধুরীসহ অনেককে ইদ্রিস টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাষ্টার শামসুল আলম বলেন, ইদ্রিস এসব অপকর্ম করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে।
আগামী ৭ মে ২০২৬ চট্টগ্রাম নগরীর একটি হলরুমে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চৌধুরীর শোকসভার আয়োজন করেছে ‘আনোয়ারা ফাউন্ডেশন’ নামের এই ব্যবসাপ্রতিষ্টান। আয়োজকরা এতে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রচার করছে, চট্টগ্রাম- ১৩ আনোয়ারা কর্ণফুলির সাংসদ আলহাজ্ব সরওয়ার জামাল নিজাম-এর নাম। সুভাষ চৌধুরীর শোকসভার বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক সিকদার বলেন, মাননীয় সাংসদ আলহাজ্ব সরওয়ার জামাল একজন প্রকৃত স্বাধীনতাসংগ্রামী এবং ৪ বারের নির্বাচিত সফল এমপি। তিনি বলেন, একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার শোকসভায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনা। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আশাকরি মাননীয় সাংসদ ৭ তারিখের ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চৌধুরীর শোকসভায় উপস্থিতির সিদ্ধান্তÍ পরিবর্তন করবেন।

আলোকিত প্রতিদিন /০৫ মে ২০২৬ /মওম

- Advertisement -
- Advertisement -