বিশেষ প্রতিবেদক:
দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নতুন করে বড় আমদানির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এপ্রিল মাসে ৫৩ হাজার ৩৬৪ টন অকটেন আমদানির পর আগামী দুই মাসে আরও ৫০ হাজার টন অকটেন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল আমদানিও বাড়ানো হবে।
যুদ্ধের প্রভাব: তীব্র সংকট ও ভোগান্তি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর পর থেকেই দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের চাপ পড়ে। বিশেষ করে অকটেনের ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক ফিলিং স্টেশন তেলশূন্য হয়ে পড়ে, আর যেখানে তেল ছিল সেখানে তৈরি হয় দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন গ্রাহকরা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে এবং পরে সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ায়। ফুয়েল পাস চালুসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও শুরুতে সংকট পুরোপুরি কাটেনি। তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এপ্রিল মাসে বিপিসির তেল আমদানির চিত্র
এপ্রিল মাসের শুরুতে জ্বালানি তেলের ভোগান্তি ছিল অনেক বেশি। পাশাপাশি বিপিসির মজুতও চাপের মধ্যে ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাসব্যাপী আমদানি কার্যক্রম চালু রাখে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আমদানি করা ১১টি কার্গো যথাসময়ে তেল খালাস সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে ৩ এপ্রিল ইউনিপ্যাকের এমটি শ্যান গ্যাং ফা হিয়েন ৩৪ হাজার ৪৩ টন ডিজেল ও ইউনিপ্যাকের আরেকটি জাহাজ এমটি ইউয়ান ঝিং হে ২৭ হাজার ৩৭৪ টন ডিজেল খালাস করে। ৮ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৮ হাজার টন ডিজেল, ভিটল এমটি সেন্ট্রাল স্টার ২৬ হাজার ১ টন অকটেন ও বিএসপি এমটি ইস্টার্ন কুইন ২৫ হাজার ৮৬৪ টন ফার্নেস অয়েল খালাস করে।
১৩ এপ্রিল এমটি গ্রেট প্রিন্সেস কার্গো থেকে ১১ হাজার ৯০০ টন জেট ফুয়েল, ১৪ এপ্রিল এমটি লুসিয়া সলিস ৩৪ হাজার ৯৯১ টন ও এমটি টর্ম দামিনি ৩২ হাজার ৯৩৫ টন ডিজেল খালাস করেছে। এছাড়া ১৬ এপ্রিল নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে আরও ৫ হাজার টন ডিজেল, ১৭ এপ্রিল এমটি নেইভ সিয়েলো থেকে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেন, এমটি অকট্রি কার্গো থেকে ৩৫ হাজার ৩৪৫ টন, ১৮ এপ্রিল এমটি কেইপ বনি জাহাজ থেকে ৩৩ হাজার ৩৯৭ টন ডিজেল এবং ১৯ এপ্রিল এমটি লিয়ান সং হু ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেল খালাস করেছে। খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে ৪১ হাজার ৯০৭ টন ডিজেলবাহী এমটি লিয়ান সং হু ও ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেনবাহী এমটি নেইভ সিয়োলো।
দেশে আগমনের পর্যায়ে রয়েছে ৬০ হাজার টন ডিজেলবাহী দুটি কার্গো জাহাজ (ভিটল ও এমটি হাফনিয়া চিতাহ কার্গো)। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দুটি কার্গো ফোর্স ম্যাজিউর (অনির্ধারিত কারণে স্থগিত) হয়েছে। এর মধ্যে ইউনিপ্যাকের কার্গোটির ৩০ হাজার টন ডিজেল এবং থাইল্যান্ডভিত্তিক পিটিএলসিএল কার্গোটির ৮ হাজার টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানির কথা ছিল। সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল ওকিটিউএর ৩০ হাজার টন ডিজেলবাহী কার্গো মে মাসে ডেফার করা হয়েছে।
একাধিক চালানে ডিজেল আমদানি হয়েছে
অকটেন ও জেট ফুয়েলের উল্লেখযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে/কিছু কার্গো খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে, আবার কিছু জাহাজ দেশের পথে।তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি চালান স্থগিত (ফোর্স ম্যাজিউর) হয়েছে এবং কিছু আমদানি পিছিয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের সংকটে রিফাইনারি বন্ধ
অপরিশোধিত তেলের ঘাটতির কারণে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) প্রায় ১৮ দিন বন্ধ রয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে গিয়ে আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। একটি ট্যাংকার জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে দেশে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
মে-জুনে বড় পরিকল্পনা
বিপিসি জানিয়েছে— মে মাসে ১ লাখ টন এবং জুনে আরও ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হবে/একই সময়ে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস অয়েলের বড় চালান আনা হবে। এপ্রিল শেষে মজুতে থাকা জ্বালানি দিয়ে সীমিত সময় চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা
বিপিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আমদানি কার্যক্রম চালু রয়েছে। নতুন চালানগুলো সময়মতো পৌঁছালে সামনে জ্বালানি সংকট থাকবে না বলেই আশা করছে সংস্থাটি। সংক্ষেপে, সাম্প্রতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে বিপিসি এখন আমদানি বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা যায়।
আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

