নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) ২০২৬-২০২৭ কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে একচেটিয়া জয় পেয়েছে বিএনপিপন্থিদের আইনজীবীদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল বা নীল প্যানেল। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২৩টি পদের প্রতিটিতেই বিপুল ভোটে জয় পেয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে তারা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কোনো প্যানেল অংশ নেয়নি। আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের দাবি, তাদের অংশগ্রহণের সুযোগই দেওয়া হয়নি। তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচন করতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচন করতে না পারায় তাদের সমর্থকেরা ভোটও দেননি এবারের নির্বাচনে।
নির্বাচনে নীল প্যানেলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সমর্থিত আইনজীবী ঐক্য পরিষদ বা‘সবুজ প্যানেল’। নির্বাচনে গুরুতর জালিয়াতি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারচুপির অভিযোগ তুলেছে এনসিপি সমর্থিত ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স অ্যালায়েন্স। তবে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুই দশকের বেশি সময় একসঙ্গে নির্বাচন করা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীপন্থি আইনজীবীরা এবার আলাদা প্যানেলে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনে ছিল তাদের জোটসঙ্গী গণঅধিকার পরিষদ। আর জামায়াতের সঙ্গে ছিল তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি।
বিএনপিপন্থিদের ‘ক্লিন সুইপ’ : শুক্রবার (১ মে) দিবাগত রাতে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ২৩টি পদের প্রতিটিতেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। নির্বাচন বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি একটি ‘ক্লিন সুইপ’ বা সম্পূর্ণ একচেটিয়া বিজয়।
‘ক্লিন সুইপ’ বলার কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেল (জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত) একটি পদেও জয়ী হতে পারেনি। সব পদে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে নীল প্যানেল। এতে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতাই অর্জন করেননি, পুরো কার্যনির্বাহী কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছেন। আইনজীবীরা বলছেন, পুরো কমিটিতে বিরোধী প্যানেলের একজন প্রার্থীও জয় না পাওয়ায় এই ফলাফলকে ‘ক্লিন সুইপ’ হিসেবে চিহ্নিত করার মূল কারণ, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ সম্পূর্ণভাবে ভোটের ম্যান্ডেট হারিয়েছে।
কে কত ভোট পেয়েছেন : নীল প্যানেলের প্রার্থীরা প্রতিটি পদেই বিপুল সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন, যা নির্বাচনে তাদের একচেটিয়া আধিপত্যকে স্পষ্ট করে। নীল প্যানেলের বিজয়ী প্রার্থীদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন জামায়াত-এনসিপি সমর্থিত সবুজ প্যানেলের আইনজীবীরা।
নির্বাচনে সভাপতি পদে নীল প্যানেলের মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া ৪ হাজার ৪৬৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের এস এম কামাল উদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৯ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইউনূস আলী বিশ্বাস পেয়েছেন ১৪৬ ভোট।
সাধারণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মোহাম্মদ আবুল কালাম খান ৪ হাজার ৪৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে সবুজ প্যানেলের মো. আবু বক্কর সিদ্দিক পেয়েছেন ১ হাজার ৬৬১ ভোট। এই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শহিদুল্লাহ ৪২৪ ভোট ও বলাই চন্দ্র দেব ৩৫৫ ভোট পেয়েছেন। সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে নীল প্যানেলের মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ৪ হাজার ৫০৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. শহিদুল ইসলাম পেয়েছেন ২ হাজার ৫৪ ভোট। সহ-সভাপতি পদে নীল প্যানেলের মো. আবুল কালাম আজাদ ৪ হাজার ৪৩৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. লুৎফর রহমান আজাদ পেয়েছেন ২ হাজার ১১৩ ভোট।
কোষাধ্যক্ষ পদে নীল প্যানেলের মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান (আনিস) ৩ হাজার ৯৪৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. আজমত হোসেন পেয়েছেন ২ হাজার ৫০৫ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম পেয়েছেন ২১১ ভোট। সিনিয়র সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. এলতুতমিশ সওদাগর (অ্যানি) ৪ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. শাহীন আক্তার পেয়েছেন ২ হাজার ২২৪ ভোট।
সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. মাহাদী হাসান জুয়েল ৩ হাজার ৬৯৯ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া পেয়েছেন ২ হাজার ২৮৬ ভোট। এই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান আবুল হোসেন পেয়েছেন ৬২৫ ভোট। গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের খন্দকার মাকসুদুল হাসান (সবুজ) ৪ হাজার ৩২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, বিপরীতে নীল প্যানেলের মো. শাহাদাত হোসাইন পেয়েছেন ২২৫৫ ভোট।
সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মারজিয়া হীরা ৩ হাজার ৮৭৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের বিলকিস আক্তার পেয়েছেন ২ হাজার ২৪৯ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী ওলিদা বেগম পেয়েছেন ৫৯৭ ভোট। অফিস সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. আফজাল হোসেন মৃধা ৩ হাজার ৯৪০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের আব্দুর রাজ্জাক পেয়েছেন ২ হাজার ১৭৬ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জাকির হোসেন পেয়েছেন ৫৭৮ ভোট। ক্রীড়া সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের মো. সোহেল খান ৪ হাজার ৪৫০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের মো. বাবুল আক্তার বাবু পেয়েছেন ২ হাজার ৫১০ ভোট।
সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের এ. এস. এম ফিরোজ ৪ হাজার ১৪৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সবুজ প্যানেলের শাহজাহান মোল্লা পেয়েছেন ২ হাজার ৫৩৩ ভোট। তথ্য ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে নীল প্যানেলের শফিকুল ইসলাম শফিক ৪ হাজার ৫৯৭ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন, যেখানে সবুজ প্যানেলের মুস্তাফিজুর রহমান মাসুদ পেয়েছেন ২ হাজার ৭৯ ভোট।
সদস্য পদেও নীল প্যানেলের নিরঙ্কুশ জয় : সদস্য পদেও নীল প্যানেলের প্রার্থীরা আধিপত্য বজায় রেখেছেন। সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪২৩ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছেন ফারজানা ইয়াসমিন। এছাড়া নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন নীল প্যানেলের মো. নজরুল ইসলাম (মামুন) ৪ হাজার ৩০৩ ভোট, মো. আদনান রহমান ৪ হাজার ২৭৫ ভোট, সৈয়দ সারোয়ার আলম (নিশান) ৪ হাজার ৯ ভোট, মামুন মিয়া ৩ হাজার ৯৫১ ভোট, মো. নিজাম উদ্দিন ৩ হাজার ৮৯৪ ভোট, মো. সানাউল ৩ হাজার ৮৮৪ ভোট, মুজাহিদুল ইসলাম (সায়েম) ৩ হাজার ৭৪০ ভোট, এ. এইচ. এম রেজওয়ানুল সাঈদ (রোমিও) ৩ হাজার ৫০৪ ভোট ও শেখ শওকত হোসেন ৩ হাজার ৪১১ ভোট।
অন্যদিকে, পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে মো. জহিরুল ইসলাম ২ হাজার ৬৩৫ ভোট, মো. কাইয়ুম হোসেন নয়ন ২ হাজার ৪২৭ ভোট, বেলাল হোসেন ২ হাজার ৩৭২ ভোট, দিলরুবা আক্তার (সুবর্ণা) ২ হাজার ৩০৯ ভোট, মো. শাহ আলম ১,৯৫৮ ভোট, কাওসার আহমেদ ১ হাজার ৯৫৪ ভোট, মো. মহসিন (রেজা) ১ হাজার ৯৩৪ ভোট, মো. ওমর ফারুক ১ হাজার ৯১৭ ভোট, মোশাররফ হোসাইন ১ হাজার ৮৬৯ ভোট, মো. ইউনুস ১ হাজার ৮২৯ ভোট এবং মৌসুমী বেগম (ঢাকাইয়া) ১ হাজার ১২২ ভোট পেয়েছেন। সব মিলিয়ে, প্রতিটি পদে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে এবারের ঢাকা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে বিএনপিপন্থি নীল প্যানেল।
ভোট দেওয়ার হার মাত্র ৩৪ শতাংশ : দুইদিনব্যাপী নির্বাচনে ভোট নেওয়া হয় গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল। প্রথম দিন ২৯ এপ্রিল ২ হাজার ৭৫৯ জন ভোট দেন, দ্বিতীয় দিন ৩০ এপ্রিল ভোট দেন ৪ হাজার ৩১০ জন। ফলে দুই দিনে মোট ৭ হাজার ৬৯ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দেওয়ার হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের মধ্যে ১৩ হাজার ৭১৬ জনই ভোট দেননি।
গত আটটি নির্বাচনের তুলনায় এটি অন্যতম সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ২০১৮-১৯ সালের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৬২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৪-২৫ সালে ৪৬ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা আরও কমেছে।
গত কয়েক বছরের নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে ২১ হাজার ২০৮ ভোটারের মধ্যে ৯ হাজার ৬৯০ জন বা ৪৬ শতাংশ ভোট দেন। ২০২৩-২৪ সালে ভোটার ছিল ১৯ হাজার ৬১৮ জন, ভোট দেন ৯ হাজার ২৪৩ জন বা ৪৭ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে ৫৭ শতাংশ, ২০২১-২২ সালে ৪৯ শতাংশ, ২০২০-২১ সালে ৫১ শতাংশ এবং ২০১৯-২০ সালে ৫২ শতাংশ ভোট পড়ে।
আলোকিত প্রতিদিন /০২ মে ২০২৬ /এমআরএম

