আজ বৃহস্পতিবার, ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ।   ৩০ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বেকারত্বের চাপে শ্রমজীবী মানুষ. বিপন্ন মৌলিক অধিকার

আরো খবর

আলমগীর মতিন চৌধুরী ঃ

বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক মে দিবস আজ। শ্রমিকদের আত্মত্যাগের স্মরণে এই দিনটি বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ‘মেডে’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। এ বছর বাংলাদেশে মে দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সুষ্ঠু শ্রমিক কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রম অধিকার আদায়ের এ দিনটি বছরের পর বছর ধরে বিশ্বব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। শ্রমিকদের সম্মানে মে দিবস কিংবা পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ। কিন্তু যাঁদের নিয়ে এই দিবস, তাঁরা এ সম্পর্কে কতটা অবগত জানেন বুঝেন ? অনেক শ্রমিক জানেনই না এর ইতিহাস। উনিশ শতাব্দীর আগে কারখানার শ্রমিকদের দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চাইতেও বেশি। কিন্তু কাজ অনুপাতে পারিশ্রমিক ছিল খুবই কম। যা তাঁদের জীবনধারণের জন্য যথাযথ ছিল না। একসময়ে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে ও আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে একদল শ্রমিক মালিক পক্ষকে দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মসময় নির্ধারণের দাবি জানায়। এ দাবি পূরণের সময় হিসেবে ১৮৮৬ সালের ১ মে নির্ধারণ করেন শ্রমিকেরা। কিন্তু কারখানার মালিকেরা শ্রমিকদের এ দাবি মেনে নেয়নি। ফলে ১৮৮৬ সালের ৪মে শিকাগোর হে মার্কেট নামক স্থানে ফের আন্দোলন গড়ে তোলেন শ্রমিকেরা। সেখানে পুলিশ আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর গুলি বর্ষণ করলে নিহত হন ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক। এ ঘটনার দুই বছর পর ১৮৮৯ সালে প্যারিসে ফরাসি বিপ্লবের ১০০ বছর পূর্তিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে শিকাগো শ্রমিক আন্দোলনের দিনটিকে ১৮৯০ সাল থেকে পালনের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। পরের বছর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে প্রস্তাবনাটি আনুষ্ঠানিক ভাবে গৃহীত হয়। পরে ১৯০৪ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বব্যাপী মে মাসের প্রথম দিন মিছিল ও শোভাযাত্রার আয়োজন করতে সব সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল ও শ্রমিক সংঘের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এ আহ্বানের সাড়া হিসেবে বিশ্বের প্রায় সব শ্রমিক সংগঠন ১মে বাধ্যতামূলক কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক দেশের শ্রমিকেরা মে মাসের ১ তারিখ সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানান। বিভিন্ন দেশে মে দিবস সরকারিভাবে ছুটির দিন হিসেবে পালিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে রাশিয়া, চীন, বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এ দিনটির তাৎপর্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার দাবি। শ্রমিকদের অধিকার ও দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয়। স্বাধীনতার পর মে দিবস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে গণমাধ্যমগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান ও লেখা প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে আজ জাতীয় ছুটির দিন। অন্যান্য অনেক দেশেও এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। ‘মহান মে দিবস’ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, শ্রম ও পেশাজীবী সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার পরিবেশ সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ১৮৮৬ সালের এই দিনে শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক ও শ্রমের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করে। এই দিনটি শুধু সাধারণ দিবস নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের অনুপ্রেরণারউৎস। তিনি শ্রমিক অধিকারের জন্য আত্মত্যাগকারীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান। মে দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শ্রমিক শ্রেণির জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই দিবসের তাৎপর্য সুদূর প্রসারী। এর ফলে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় আট ঘণ্টায় নেমে আসে এবং তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য মর্যাদা পেতে শুরু করেন। মে দিবসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়, তার প্রভাবে ধীরে ধীরে সামাজিক শ্রেণি-বৈষম্য হ্রাস পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শ্রম অধিকার রক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে শ্রম সংস্কারের কাজ করছেন বলে পিএমও অফিসের একটি সূত্র জানিয়েছেন। অপ্রিয় হলেও সত্য, যে উদ্দেশ্যে আমরা মে দিবস পালন করি, সেটি কতটা সফল হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বারবার বেকার হচ্ছে শ্রমজীবী লাখ লাখ মানুষ। কেবল ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শ্রমজীবী মানুষ। করোনা মহামারির কারণে তিনবছরে ১শ ৪৩টি ছোটবড় শিল্প কারখানা বন্ধ হয়, এসময়ে বেকার হয়েছে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক কর্মচারি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে ৩শ ৫৪ শিল্প বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে কাজ হারিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শ্রমজীবী। বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা কাজ হারাচ্ছেন, ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। বিগত নয় মাসে প্রায় একলাখ ২১ হাজার ৯শ বত্রিশ জন প্রবাসী বাংলাদেশে ফিরেছেন, তারা আর প্রবাসে যাননি। কারণে অকারণে প্রবাস জীবনে প্রাণ হারাচ্ছে বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা। কাতারে অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম প্রস্তুত কালে সেখানে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মৃত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ১ হাজার ১৮। অভিযোগ রয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেশটির প্রশাসন লাশের ময়নাতদন্ত করতে দেয়নি। মানা হয়নি শ্রমিক আইন। লক্ষ্য করলে দেখাযায়, বাংলাদেশে মে দিবসে সব সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় সত্য, পেটের তাগিদে অসংখ্য মানুষ রুটিরুজির সন্ধানে কাজে বেরিয়ে পড়ে। কারণ এক বেলা কাজ না করলে তাঁর পরিবারকে কাটাতে হবে অনাহারে। কারও কারও আবার মেলে না ছুটি। ছুটির দিনে কাজের জন্য জোটে না বাড়তি অর্থও। আট ঘণ্টা কাজের কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ম চোখে পড়ার মতো। কাজ করতে হচ্ছে আট ঘণ্টার অধিক। দেওয়া হচ্ছে না ওভারটাইম কিংবা অতিরিক্ত সময়ের পয়সা। তাতে মে দিবস পালন তো এসব মানুষের কাছে একপ্রকার বিলাসিতার মতো। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কর্মরত। প্রতিটি তৈরি পোশাক কারখানায় আট ঘণ্টার বেশি কাজ হয় প্রতিদিন। ওভারটাইম করতে আগ্রহী না থাকলেও বাধ্য হয়ে তা করতে হয়। সেই ওভারটাইমের টাকাও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। দিতে নানা ছলচাতুরী করে মালিক কর্তৃপক্ষ। শুধু গার্মেন্ট শিল্প নয়, অধিকাংশ শ্রমখাতে এমন পরিস্থিতি দেখাযায়। ইপিজেড অথবা জোনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকের জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দেশে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন থাকার পরও দেশের রাজনৈতিক কারণে অসংখ্য শ্রমিক হারিয়েছেন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস। অফিসে চাকরি করেন, এমন ১৬ ভাগ মানুষ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে কাজ হারিয়েছে। চাকরি আছে কিন্তু বেতন নেই, এমন মানুষের সংখ্যা আরও বেশি। শালিকানাধীন ২৯ ভাগ চাকরিজীবীর বেতন কমে গেছে। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের হিসাবে রাজনৈতিক কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একদিনে ১৯ প্রতিষ্ঠান মধ্যে কর্মরত ১ লাখ ১৩ হাজার শ্রমজীবী চাকরি হারিয়েছে। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও আমাদের শ্রমিকদের করুণ অবস্থার চিত্র ফুটে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা কাজ হারাচ্ছেন, ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে তাঁরা। তা ছাড়া, বাংলাদেশেও রানা প্লাজা, তাজরীন গার্মেন্টস, রূপগঞ্জসহ অনেক দুর্ঘটনায় অসংখ্য শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছে, জীবন্ত পুড়ে কয়লা হয়েছে। সেই সঙ্গে হারিয়েছে বহু আশা ও স্বপ্ন। অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সামান্য ক্ষতিপূরণে তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। অনেক সময় সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিলেও মালিক-শ্রমিক সমন্বয়হীনতায় বৃথা যায় সব। মে দিবসের গল্প কেবল বছরান্তে ঘটাকরে ভেসে আসে নজরে। ফলে শ্রমিকরা বুঝতেই পারে না আসলে শ্রমিক দিবস কি ? এতেই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের শ্রমিকদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। কিন্তু মে দিবস যায়, মে দিবস আসে। তাঁদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। ফলে পালনের জন্য মে দিবস পালিত না হোক। এর মুখ্য উদ্দেশ্যই হোক শ্রমিকের অধিকার আদায় ও শ্রমিকের নিরাপত্তা। আট ঘণ্টার অধিক কাজ নয়। এর বেশি কাজ করলে ন্যায্য মজুরি দিতে হবে, সেটি সময়মতো। বাংলাদেশে অসংখ্য শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থে তাদের আরও বেশি অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। শ্রমিকদের সব দাবি মালিকপক্ষ, সরকারের কাছে তারা তুলে ধরতে পারে। তাতে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দূরত্ব অনেকখানি লাঘব হবে। শ্রম আইনগুলো কঠোরতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে তৈরি করতে হবে শ্রমিকবান্ধব আইন, যা শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন শ্রমজীবী সমাজ। শ্রমজীবী মানুষের হাত দিয়ে গড়েছে সভ্যতা, শক্তিশালী হয়েছে জাতি। সমৃদ্ধশালী হোক বাংলাদেশ ও দেশের অর্থনীতি।

আলোকিত প্রতিদিন /৩০ এপ্রিল ২০২৬ /মওম

- Advertisement -
- Advertisement -