শহীদুল ইসলাম রুবেল:
বাংলাদেশের দুর্যোগের ইতিহাসে বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের কথা যতটা গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, ‘বজ্রপাত’ ঠিক ততটাই অবহেলিত থেকে গেছে দীর্ঘকাল। অথচ পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে দেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের নাম বজ্রপাত। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের চেয়েও প্রতিবছর এই ‘নীরব ঘাতকে’র আঘাতে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাত প্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল।
নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়লেও এখানকার কৃষকদের সুরক্ষায় নেয়া পদক্ষেপগুলো এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ৬ বছরে ৬২ জনের মৃত্যুতেও যেন টনক নড়েনি প্রশাসনের। অকার্যকর লাইটনিং অ্যারেস্টার আর অস্তিত্বহীন তালগাছ প্রকল্পের আড়ালে অরক্ষিতই থেকে গেছে এ জনপদ।ফলে প্রায় প্রতিদিনেই কোনো না কোনো হাওরে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। মাঠজুড়ে পাকা বোরো ধান থাকলেও জীবনঝুঁকির কারণে কৃষি শ্রমিকেরা মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটতে যাচ্ছেন, আর তাতেই ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
তথ্য বলছে, সোমবার (২৭এপ্রিল) সকাল ৯টার দিকে খালিয়াজুরী উপজেলার জগন্নাথপুর ধনু নদীতে বর্শি দিয়ে মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে আব্দুল মোতালিব (৫৫) নামে ১ মৎস্য শিকারীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত আব্দুল মোতালিবের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বাঘবেড় গ্রামে। এদিকে খালিয়াজুরী উপজেলার সাতগাঁও গ্রামের কৃষক হালান মিয়া (৫০) সোমবার (২৭এপ্রিল) দুপুরের দিকে বৃষ্টিপাত শুরু হলে বাড়ির সামনে থেকে গরু আনতে গেলে হঠাৎ বজ্রপাতে মারা যায়। তিনি সাতগাঁও গ্রামের নেকবর খার পুত্র। অপরদিকে (২৭এপ্রিল) সোমবার দুপুর ৩ টার দিকে খালিয়াজুরীর কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ছায়ার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে শুভ মন্ডল নামে আরও ১জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত শুভ মন্ডল সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার আকনাদিগীর চর গ্রামের অফিকুল মন্ডলের পুত্র। সে সিরাজগঞ্জ থেকে অন্যান্য শ্রমিকদের সাথে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় ধান কাটতে এসেছিল।
এ ছাড়া ও মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া,আটপাড়া, কলমাকান্দা,দুর্গাপুর হাওরের কোনো না কোনো স্থানে বজ্রপাতের কারণে আহত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। যদিও জেলায় হাওর পাড়ের মানুষদের সুরক্ষায় সরকার বজ্রনিরোধক প্রকল্প হাতে নেয়। এসব বজ্রনিরোধক দণ্ড অপরিকল্পিত স্থাপন ও মানহীন যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে তা অল্পদিনেই বিকল হয়ে গেছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি।প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, নেত্রকোনায় বজ্রপাতে ২০২০ সালে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২জন, ২০২৪ সালে ৮ জন ও ২০২৫ সালে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আর চলতি বছরের এপ্রিলে মারা গেছেন আরো ৬ জন। তবে সরকারি হিসাবের চেয়ে সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি বলে দাবি স্থানীয়দের। এসব এলাকায় ধান কাটার মৌসুমে এপ্রিল ও মে মাসেই বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
নেত্রকোনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে ২০২২ সালে নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ (বজ্রনিরোধক দণ্ড) স্থাপন করা হয়। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন-চার লাখ টাকা। নিয়ম অনুযায়ী দণ্ডগুলো হাওরে বা খোলা প্রান্তরে স্থাপন করার কথা। এছাড়া বজ্রপাত প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে সরকার দেশজুড়ে তালগাছ রোপণের প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় নেত্রকোনায়ও তালগাছ রোপণ করা হয়।
নেত্রকোনার মদন উপজেলার মাঘান গ্রামের কৃষক খন্দকার সোহাগ, গোবিন্দশ্রী গ্রামের আবুল হোসেন, খালিয়াজুরী উপজেলান বোয়ালী গ্রামের আবুল কালাম, ইছাপুরের সুরঞ্জন সরকারসহ অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন,খালিয়াজুরীর প্রবেশমুখ উচিতপুরে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করার কথা হাওরের ফাঁকা জায়গায়। কিন্তু অধিকাংশ বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছে বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। এগুলো স্থাপনের মাত্র ২ বছরের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ যন্ত্রই এখন অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। অনেক স্থানে স্থাপিত দণ্ডগুলোর যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে অথবা বিকল হয়ে স্রেফ খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।’তালগাছ রোপণ প্রকল্পের বিষয়ে তারা আরো বলেন, ‘রোপণকৃত চারাগুলোর বেশির ভাগই পরিচর্যার অভাবে মারা গেছে। ফলে কয়েক কোটি টাকার এ উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বেসরকারি সংস্থা বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান বলেন, ‘মানুষের জীবন রক্ষায় স্থাপিত বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে।কৃষিবিদ ড.শওকত আকবর বলেন, তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক বজ্রপাত থেকে রক্ষায় সহায়ক বলে মনে করা হয়। তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাত নিরোধে সহায়তা করে। তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকে। এ কারণে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় তালগাছ রোপণে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে।
২০১৮ সালে সারা দেশের সঙ্গে নেত্রকোনায়ও সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন এসব তালগাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। এগুলো রোপণের পর আর কোনো পরিচর্যা করা হয়নি। ফলে এ প্রকল্পের কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমিন জানান, বজ্রনিরোধক দণ্ডে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় না,ফলে এটি সাধারণত নষ্ট হয় না। দাঁড়িয়ে থাকলেই হয়। বজ্রনিরোধক দণ্ডে ম্যাগনেট থাকে যার মাধ্যমে ৩০০ ফুট এরিয়া কভার করে। নেত্রকোনা সদর, খালিয়াজুরী ও কলমাকান্দা উপজেলায় বেশ কয়েকটি ফাঁকা জায়গায় তা নির্মাণ করা হয়েছে।তবে সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের প্রকল্প নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
আলোকিত প্রতিদিন / এম আর এম

