কামাল হোসেন, গাজীপুর সদর প্রতিনিধি: গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজার এলাকায় অবস্থিত মেসার্স উপবন ফিলিং স্টেশনে শত শত যানবাহন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না চালকরা। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ—রাত গভীর হলেই ড্রামে ভরে তেল পাচার করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে বাইরের দোকানগুলোতে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ ড্রামে তেল বিক্রি করছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন চালকরা। তাদের প্রশ্ন—এটি কি শুধুই সরবরাহ সংকট, নাকি এর আড়ালে রয়েছে কোনো সিন্ডিকেট?
রোববার রাতে সরেজমিনে দেখা যায়, গাজীপুর সদর উপজেলার শিরিরচালা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘেরবাজারে অবস্থিত মেসার্স উপবন ফিলিং স্টেশন। সন্ধ্যার পর ডিজেল আসবে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন যানবাহন তেল নেওয়ার জন্য মহাসড়কের একপাশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। সন্ধ্যায় তেল দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয় রাত ১২টার পর। তবে অভিযোগ উঠেছে, লাইনে থাকা গাড়িগুলোকে তেল না দিয়ে বড় বড় ড্রামে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কয়েক দিনের তেল মাত্র ৩–৪ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেক চালক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে কৃষকরাও বিপাকে পড়ছেন।
পরের দিন নতুন বাজার থেকে রাজেন্দ্রপুর পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন দোকানে প্রকাশ্যে বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে। যেখানে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, সেখানে এসব দোকানে অতিরিক্ত মূল্য দিলেই সহজে পাওয়া যাচ্ছে তেল।
কাভার্ড ভ্যান চালক রহিম বলেন, সন্ধ্যার পর তেল আসবে শুনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রাত ১২টার পর তেল ছাড়লেও কোনো গাড়িতে না দিয়ে বড় ড্রামে বিক্রি করা হয়। কেউ কেউ পাঁচশ থেকে এক হাজার লিটার পর্যন্ত তেল নিয়ে যাচ্ছে। এতে তেল চলে যাচ্ছে কালোবাজারিদের হাতে।
এক অ্যাম্বুলেন্স চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। লাইনে দাঁড়িয়েও ঠিকমতো তেল পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে রোগী পরিবহন কঠিন হয়ে পড়বে।
মেসার্স উপবন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আহসান হাবিব জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। ঠিক মতো সরবরাহ থাকলে পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, রাত ১২টার পর ফিলিং স্টেশন থেকে ড্রামে তেল বের করা হয়, যা পরে মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, দিনে সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পায় না, কিন্তু রাতে ড্রামে তেল চলে যায়। এটি নিয়মিত ঘটনা।
আরেক বাসিন্দা জানান, কিছু অসাধু কর্মচারী ও বাইরের লোকজন মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। তারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাভবান হচ্ছে। শুধু এই একটি স্টেশন নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও এমন অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—যদি সত্যিই রাতে তেল পাচার হয়ে থাকে, তাহলে প্রশাসনের নজরদারি কোথায়? নিয়মিত তদারকি থাকলে এমন অভিযোগ ওঠার কথা নয়। দীর্ঘ লাইনের কারণে শুধু চালকরাই নয়, পথচারী, শিক্ষার্থী ও অফিসগামী মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন। এতে জরুরি সেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।
গাজীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাত হোসেন জানান, যেসব শিল্পকারখানায় জেনারেটর চালাতে জ্বালানি তেল প্রয়োজন, তাদের জন্য সরকার ‘ফুয়েল কার্ড’ চালু করেছে। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা তেল সংগ্রহ করতে পারবে। এছাড়া ড্রামের মাধ্যমে বা খোলা তেল বিক্রি কিংবা পাচার করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপবন ফিলিং স্টেশনের বিষয়েও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
আলোকিত প্রতিদিন/এপি

