এস কে সিরাজ:
সুন্দরবনে মধু আহরণ করতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া জেলেদের ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে শ্যামনগরের কয়েকটি পরিবার। পুরো ঘটনায় উঠে এসেছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই, সীমান্তসংলগ্ন উত্তেজনা এবং প্রকৃতির নির্মম রূপ। এ অবস্থায় নিখোঁজদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ছুটে যান সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম।
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, গত ১ এপ্রিল শ্যামনগর উপজেলার তারানীপুর গ্রামের মোহাম্মদ শেখের পুত্র আল মামুনসহ মোট ৮ জন বৈধ পাশ নিয়ে সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী এলাকা দিয়ে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তারা তালপট্টি সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করেন এবং ভুলবশত ভারতীয় অংশে যান। সেখানে একদিন অবস্থানের পর একটি খালের ভিতরে কাজ করার সময় ভারতীয় বনরক্ষীরা তাদের নৌকাটি আটক করে নিয়ে যায়। এতে তারা জঙ্গলের মধ্যে নৌকাবিহীন অবস্থায় চরম বিপদের মুখে পড়েন।
নৌকা হারিয়ে তারা জঙ্গলের ভিতরে কিছু সময় অবস্থান করার পর সবাই একত্রিত হয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। নদীর তীরে এসে গেমো গাছ নদীর তীরে পাওয়া ড্রাম দিয়ে একটি ভেলা তৈরি করেন এবং আটজন একসঙ্গে সেই ভেলায় উঠে বাংলাদেশে ফেরার চেষ্টা শুরু করেন।
গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কাছিকাটা এলাকার পাগলের খাল সংলগ্ন নদীতে তারা ভেলা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু নদীর মাঝামাঝি পৌঁছানোর পরপরই হঠাৎ প্রবল ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়। তীব্র স্রোতে ভেলাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং বাংলাদেশে আসার পরিবর্তে উল্টো দিকেও সরে যেতে থাকে।
পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তারা ভেলাটি খুলে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় কেউ ড্রাম ধরে, কেউ সাঁতরে বাঁচার চেষ্টা করেন। ঝড়, বৃষ্টি আর তীব্র স্রোতের মধ্যে তারা সারা রাত নদীতে ভেসে থাকেন।
জীবিত ফিরে আসা মনিরুল ইসলাম (পিতা আরাব মোল্লা, বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর) জানান, “আমরা আটজন একসাথে ভেলায় উঠেছিলাম,মাঝ নদীতে ঝড় শুরু হলে ভেলা আর নিয়ন্ত্রণে ছিল না, পরে ভেলা খুলে যে যার মতো বাঁচার চেষ্টা করি, সারা রাত পানিতে ছিলাম, কানতে কানতে ভেসেছি,ভোরের দিকে আমি তীরে উঠি, পরে আরও দুইজন এবং কিছুক্ষণ পর আরেকজনকে পাই—মোট চারজন বেঁচে ফিরেছি। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ধীরে ধীরে চারজন বাংলাদেশ অংশে উঠতে সক্ষম হন। তারা হলেন— মনিরুল ইসলাম (পিতা আরাব মোল্লা, বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর, গ্রাম তারানীপুর), আল মামুন (পিতা মোহাম্মদ শেখ, বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর, গ্রাম তারানীপুর), সবুর (পিতা আকবর মোল্লা, বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর, গ্রাম গোদাড়া নয়াবেকি), ইউনুস (পিতা জলিল মোল্লা, বয়স আনুমানিক ৪২ বছর, গ্রাম গোদাড়া নয়াবেকি)। পরে তারা হলদিবুনিয়া ফরেস্ট অফিসে পৌঁছে কোস্টগার্ডের সহযোগিতা নেন। অন্যদিকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন চারজন— মিকাইল হোসেন (পিতা মৃত রহমান গাজী, বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর, গ্রাম সোরা), অলিউর রহমান লিটন (পিতা ওহিদ মোল্লা, বয়স আনুমানিক ৩৬ বছর, গ্রাম গোদাড়া নয়াবেকি), কবির হোসেন (পিতা ফারুক গাজী, বয়স আনুমানিক ৪২ বছর, গ্রাম গোদাড়া নয়াবেকি), আকবর মোল্লা (পিতা আমিন মোল্লা, বয়স আনুমানিক ৭২ বছর, গ্রাম গোদাড়া নয়াবেকি)।
তাদের পরিবারে এখনো চলছে আহাজারি ও অনিশ্চয়তা। স্থানীয় বনবিভাগ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
এ মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়ে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় অবস্থানকালেই বন বিভাগ, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে রাতভর যাত্রা করে শ্যামনগরে এসে তিনি নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।
এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমান, ভেটখালী ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মাস্টার গাজী নজরুল ইসলাম এবং শ্যামনগর উপজেলা রিপোর্টার্স ক্লাবের সদস্য মো. রাকিবুল্যাহ সোহাগসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
আলোকিত প্রতিদিন /১৩ এপ্রিল ২০২৬ /মওম

