আজ সোমবার, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ ।   ১৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ফুল চাষে নতুন সম্ভাবনা ‘বিনা গ্ল্যাডিওলাস-১

আরো খবর

খালেদ হাসান :

কৃষিভিত্তিক পণ্য হিসেবে দেশে ও বিশ্বে ফুলের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফুলের চাহিদা প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ফুল চাষ কে একটি লাভজনক ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও ফুল চাষ দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং কৃষকদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকে। ১৯৮২-৮৩ অর্থবছর থেকে ফুলকে দেশে অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে সরকার ফুলকে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকাভুক্ত করে, যা এ খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে দেশের প্রায় ২০ টি জেলায় কমবেশি ১২ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করা হচ্ছে।এদিকে ফুল চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত ‘বিনা গ্ল্যাডিওলাস১’ নামের নতুন জাত। ২০২৫ সালের ৫ মে জাতীয় বীজ বোর্ড এ জাতটি সারাদেশে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। নতুন এই জাতটির অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর দৃষ্টিনন্দন রং—গোলাপি পাপড়ির মাঝে সাদা ডোরাকাটা নকশা, যা ফুলটিকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়া ফুলের আকার বড়, গাছের উচ্চতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এটি সহজে হেলে পড়ে না। প্রতিটি স্টিকে ফুলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় উৎপাদনও বেশি হয়। বিশেষ করে, ফুলটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত ফুলদানিতে সতেজ রাখা যায়, যা বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
বিনা’র উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরীন আখতার জানান, ২০১৮ সালে গ্ল্যাডিওলাস ফুলের কয়েকটি বিদেশি জাতের করম (বীজ) সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে এসব করমের ওপর বিভিন্ন মাত্রায় গামা রশ্মি প্রয়োগ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় একটি জাতের পাপড়িতে ভিন্নধর্মী রঙের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যা মূল মাতৃ গাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে ওই উদ্ভিদটি নির্বাচন করে এর বংশ বৃদ্ধি করা হয় এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় এর ফলন ও গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষামূলক চাষ পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়ার পর জাতীয় বীজ বোর্ডে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘বিনা গ্ল্যাডিওলাস১’ জাতটি দেশে ফুল চাষে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং রপ্তানি সম্ভাবনাকেও আরও শক্তিশালী করবে। এর মাধ্যমে কৃষকরা অধিক লাভবান হবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেছেন, ইরাডিয়েশন বা বিকিরণ প্রযুক্তি বর্তমানে উদ্ভিদ প্রজননের একটি আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জেনেটিক বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব, যা ফুল চাষ শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
তিনি জানান, ফুলের নতুন জাত উদ্ভাবনে সাধারণত গামা রশ্মি (y-ray) বা এক্স-রে(x-ray) ব্যবহার করা হয়। মিউটেশন ব্রিডিং পদ্ধতির মাধ্যমে উদ্ভিদের আকৃতি, রং, ফুল ফোটার সময় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্ল্যাডিওলাস, গোলাপ, জারবেরা ও চন্দ্রমল্লিকা ফুলের নতুন রঙ, দীর্ঘস্থায়ী এবং অধিক উৎপাদনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। ড. ভূঞা আরও বলেন, বাংলাদেশে ফুলের একটি সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে। এ অবস্থায় বাণিজ্যিকভাবে ‘বিনা এর গ্ল্যাডিওলাস১’ চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ফুল রপ্তানি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আলোকিত প্রতিদিন /১২ এপ্রিল ২০২৬ /মওম

- Advertisement -
- Advertisement -